ইরানের অবরোধে হরমুজ প্রণালিতে অন্তত ২ হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকে পড়েছে। গত বুধবার পর্যন্ত আটকে পড়া এসব জাহাজের মধ্যে ৩২০ টিরও বেশি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার রয়েছে। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে সীমিত ও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কিছু জাহাজ চলাচল করতে পারছে।
আটকে পড়া জাহাজগুলোর মধ্যে ১২টি ভেরি লার্জ গ্যাস ক্যারিয়ার (ভিএলজিসি) এবং ৫০টি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার। সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেপলার’ জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার থেকে বুধবারের মধ্যে মাত্র ছয়টি জাহাজ এই প্রণালি পার হতে পেরেছে। স্বাভাবিক সময়ে এই পথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০টি জাহাজ চলাচল করে।
লয়েডস লিস্টের হিসাবমতে, গত সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৪৮টি জাহাজ এই পথ ব্যবহার করেছে। এসব জাহাজের বেশির ভাগই ইরানের উপকূলের কাছে লারাক দ্বীপ সংলগ্ন ইরান-অনুমোদিত একটি করিডোর দিয়ে যাতায়াত করছে। চলাচলকারী এসব জাহাজের সঙ্গে হয় ইরানের মালিকানা রয়েছে, নতুবা সেগুলো তেহরানের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে এই অবরোধ আরোপ করে ইরান। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। বর্তমানে এই পথে চলাচলের অনুমতি পাওয়া জাহাজমালিকদের ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি দিতে হচ্ছে, যাকে ‘তেহরান টোল বুথ’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। তবে ইরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, মালয়েশিয়াসহ তাদের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর জাহাজের ক্ষেত্রে এই ফি মওকুফ করা হতে পারে।
এদিকে মালয়েশিয়া জানিয়েছে, পেট্রোনাস, সাপুরা এনার্জি এবং এমআইএসসির মতো প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু ট্যাংকার চলাচলের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্কের কারণে তাদের জাহাজের ওপর কোনো টোল আরোপ করা হবে না বলে তেহরান কুয়ালালামপুরকে আশ্বস্ত করেছে। তবে বিপুলসংখ্যক জাহাজ অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকায় যাতায়াতে দেরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে চীন নিশ্চিত করেছে যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের অন্তত তিনটি জাহাজ সম্প্রতি এই প্রণালি পার হয়েছে। শিপ-ট্র্যাকিং তথ্যে দেখা গেছে, দুটি কনটেইনার জাহাজ দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় উপসাগর ছেড়ে বের হয়েছে এবং উচ্চগতিতে কাছাকাছি অবস্থানে একসঙ্গে চলেছে।
সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম ইরানের বাইরের কোনো কনটেইনার জাহাজ উপসাগর ছাড়তে পারল বলে জানান বিশ্লেষকেরা।
এছাড়া আরও কয়েকটি জাহাজও উপসাগর ত্যাগ করতে পেরেছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রিস-চালিত একটি সৌদি তেলের ট্যাংকার, যা ভারতের উদ্দেশে যাচ্ছিল, এবং ভারতের পতাকাবাহী কয়েকটি এলপিজি ক্যারিয়ারসহ হাতেগোনা কিছু জাহাজ।
জাহাজ চলাচল সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মাইন, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে বাঁচতে কিছু ক্রু রাতে জাহাজ চালানো বা ট্র্যাকিং ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখার মতো কৌশল অবলম্বন করছেন।
এত কিছুর পরও সৌদি আরব ও কাতারের মতো বড় উৎপাদকদের জ্বালানি রপ্তানি কার্যত বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নাবিকসহ শত শত জাহাজ উপসাগরীয় এলাকায় আটকা পড়ে আছে।
এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার পথ খুঁজতে ব্রিটেন প্রায় ৩৫টি দেশের সঙ্গে আলোচনার আয়োজন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সব পক্ষকে অনুরোধ করেছে।
এরই মধ্যে গতকাল বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও তেহরানকে হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবরোধ তোলা না হলে ওয়াশিংটন কঠোর সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে।