ত্রিপোলিভিত্তিক লিবিয়ার একাংশের সরকার ফ্রান্সের টোটাল-এনার্জিস এবং যুক্তরাষ্ট্রের কনোকো-ফিলিপসের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি একটি তেল উন্নয়ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তি দেশটির ওয়াহা অয়েল কোম্পানির উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি করতে পারে। চুক্তির আর্থিক মূল্য ২০ বিলিয়ন ডলার।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের খবরে বলা হয়েছে, লিবিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওয়াহা বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে। গত শনিবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তি ২০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দেবে, যার লক্ষ্য উৎপাদন বাড়িয়ে দৈনিক ৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে উন্নীত করা।
এই চুক্তির আওতায় ওয়াহা, কনোকো-ফিলিপস এবং টোটাল-এনার্জিস চারটি নতুন তেলক্ষেত্র উন্নয়ন করবে, যার মধ্যে ১৯টি কনসেশন এলাকায় একটি অনুসন্ধান কর্মসূচিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্ব স্বীকৃত লিবিয়ার সরকারের প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ আল-দিবেইবাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ত্রিপোলি এই চুক্তি থেকে আগামী ২৫ বছরে অন্তত ৩৭৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আশা করছে। তিনি বলেন, কনোকো-ফিলিপস এবং টোটাল-এনার্জিসের সঙ্গে এই অংশীদারত্ব একটি ‘গুণগত এবং অনন্য অর্জন, যা বিশ্ব জ্বালানি খাতের বৃহত্তম এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক শক্তিশালী করার প্রতিফলন।’
এ ছাড়া ত্রিপোলি জ্বালানি লজিস্টিকস, অনুসন্ধান এবং উৎপাদনের বিষয়ে শেভরন এবং মিসর সরকারের সঙ্গেও একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
ত্রিপোলিতে আয়োজিত এক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সম্মেলনে এই চুক্তিগুলো ঘোষণা করা হয়। সেখানে মার্কিন দূত মাসাদ বুলোস উপস্থিত ছিলেন, যিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা টিফানি ট্রাম্পের শ্বশুর। লিবিয়ায় মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘ওয়াহা কনসোর্টিয়াম অংশীদারত্বের সম্প্রসারণ যুক্তরাষ্ট্র ও লিবিয়ার মধ্যে গভীরতর সহযোগিতার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।’
আফ্রিকার বৃহত্তম তেলের মজুত লিবিয়ায় এবং একসময় এর দৈনিক উৎপাদন ছিল ওপেক সদস্য সৌদি আরবের কাছাকাছি। কিন্তু ২০১১ সালে ন্যাটো-সমর্থিত বিদ্রোহের মাধ্যমে দীর্ঘকালীন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর লিবিয়ার তেল খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কমে যায়। লিবিয়ার তেল উত্তোলনের খরচ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন এবং এই চুক্তির ফলে টোটাল ও কনোকো-ফিলিপস আগামী কয়েক দশক ধরে এই উৎস ব্যবহার করার সুযোগ পাবে।
এই চুক্তির একটি ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। এটি দিবেইবাহের নেতৃত্বাধীন ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানি এবং ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একটি আস্থার প্রতিফলন। দিবেইবাহ ২০২১ সালে জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন, যার লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আয়োজন করা। কিন্তু সেই ভোট কখনোই অনুষ্ঠিত হয়নি এবং শক্তিশালী মিলিশিয়া বাহিনীর সহায়তায় তিনি ক্ষমতায় টিকে আছেন।
অন্যদিকে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল শাসন করছেন সিআইএর সাবেক ঘনিষ্ঠ জেনারেল খলিফা হাফতার। তাঁর দুই ছেলে বর্তমানে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সেনাবাহিনীর প্রধান সাদ্দাম হাফতার যুক্তরাষ্ট্র, উপসাগরীয় দেশ এবং সম্প্রতি তুরস্কের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন। গাদ্দাফি-পরবর্তী সময়ে লিবিয়া এক গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়, যা একটি প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নেয়; যেখানে রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও ফ্রান্স হাফতারকে সমর্থন দেয় এবং তুরস্ক সমর্থন দেয় ত্রিপোলি সরকারকে।
এই জ্বালানি চুক্তিগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যে লিবিয়ার এলিট এবং বিদেশি সরকারগুলোর মধ্যবর্তী কঠিন বিভাজনগুলো এখন ঘুচে যাচ্ছে। সুদানি সেনাবাহিনীর (যাকে কায়রো, তুরস্ক ও সৌদি আরব সমর্থন করে) বিরুদ্ধে লড়াইরত আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফকে হাফতার পরিবারের সমর্থনের কারণে সৃষ্ট বিরোধের মধ্যেই মিসর এখন দিবেইবাহ সরকারের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তি করেছে। কায়রো হাফতার পরিবার ও সুদানি জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ-পূর্ব লিবিয়া থেকে আরএসএফের কাছে অস্ত্র ও গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। সাদ্দাম হাফতার বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের খুব ঘনিষ্ঠ।
যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার উভয় পক্ষকেই হাতে রাখার চেষ্টা করছে। ত্রিপোলি সফরের পর বুলোস পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজিতে যান, যেখানে তিনি সাদ্দাম হাফতার, তাঁর ভাই বেলগাসেম এবং হাফতার পরিবার-সমর্থিত পূর্বাঞ্চলীয় পার্লামেন্টের স্পিকার আগুইলা সালেহর সঙ্গে দেখা করেন। লিবিয়ায় বুলোসের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত চলছে। গত বছর মিডল ইস্ট আই প্রথম প্রকাশ করেছিল, বুলোস দিবেইবাহের শীর্ষ উপদেষ্টার সঙ্গে লিবিয়ার জব্দ করা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন।
দুই পক্ষ সেই তহবিলের কিছু অংশ লিবিয়ায় মার্কিন কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগের বিষয়েও কথা বলেছিল, যা পরে নিউইয়র্ক টাইমসও নিশ্চিত করেছে। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, বুলোসের ছেলে মাইকেল এবং তাঁর স্ত্রী টিফানি ট্রাম্প গ্রীষ্মকাল কাটিয়েছেন লিবিয়ার তেলের স্বার্থ আছে, এমন এক তুর্কি বিলিয়নিয়ারের বিলাসবহুল ইয়টে।