গাজার ভাঙাচোরা দেয়ালে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের একটি ম্যুরাল এঁকেছিল ১১ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি কিশোরী লায়ান আল-গুগা। ছোট্ট সেই শিল্পীর কল্পনাতেও ছিল না যে, তার আঁকা ছবি একদিন মাদ্রিদ পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আরও অবিশ্বাস্য ছিল পরের ঘটনাটি। কয়েক দিনের মধ্যেই স্পেনের প্রধানমন্ত্রী নিজে এক ভিডিও বার্তায় লায়ানকে নাম ধরে ধন্যবাদ জানান এবং গাজার শিশুদের উদ্দেশে বলেন, স্পেন ‘তোমাদের কথা শুনছে’, ‘তোমাদের দেখছে’, ‘তোমাদের প্রতি যত্নশীল’ এবং ‘তোমাদের কখনও ভুলে যাবে না।’
গাজা সিটির বাসিন্দা লায়ানের কাছে এটি শুধু তার শিল্পকর্মের স্বীকৃতি নয়, বরং ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া গাজা থেকেও শিশুদের কণ্ঠস্বর পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, সেই বিশ্বাসের পুনর্জন্ম।
তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে লায়ান বলেন, ‘আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এবং ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। আমি কখনও ভাবিনি যে—কোনো প্রধানমন্ত্রী আমার আঁকা ছবি দেখবেন, আমার জন্য ভিডিও বার্তা রেকর্ড করবেন, এমনকি আমার নামও বলবেন। এটা আমার কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল। এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি। এতে আমার মনে আশা জেগেছে যে আমাদের কণ্ঠস্বরও বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে পারে।’
লায়ান এই ম্যুরালটি এঁকেছিলেন স্থানীয় আরও কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গে। এটি ছিল স্পেনের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক। কারণ, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে স্পেনই গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের অন্যতম সোচ্চার সমালোচক। দেশটি বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী সানচেজ শিল্পীদের এই ‘সুন্দর উদ্যোগের’ জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, একদিন গাজার শিশুরা আবার ভয় ছাড়া নিজেদের স্কুলে ছবি আঁকতে পারবে এবং শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অবিরাম হামলায় গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, এই ভূখণ্ড পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে। যুদ্ধ লায়ানের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু। তাই তার কাছে ছবি আঁকা এখন আর শুধু রঙ-তুলির খেলা নয়, বরং নিজের জীবনের গল্প বলার একটি ভাষা।
লায়ান বলেছে, ‘আমি চাই আমার ছবি এই কথাই বলুক, গাজার ওপর অন্যায় বন্ধ হোক। আমরা অনেক কষ্ট সহ্য করেছি। কোনো দোষ না করেই আমরা সবকিছু হারিয়েছি। আমরা নির্দোষ শিশু।’ তার কথায় উঠে আসে ব্যক্তিগত বেদনার ছবিও। গাজার এই কিশোরী আরও জানিয়েছে, ‘আমরা আমাদের বাড়ি হারিয়েছি। আমি আমার খুব প্রিয় বিড়ালগুলোও হারিয়েছি। আমার বাবা ২৩ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে ইউএনআরডব্লিউএতে কাজ করার পরও কোনো দোষ না করেই চাকরি হারিয়েছেন। আমি চাই পৃথিবী জানুক, প্রতিটি ছবির পেছনে একটি সত্যিকারের গল্প এবং সত্যিকারের কষ্ট লুকিয়ে আছে।’
এদিকে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, দীর্ঘদিনের অর্থসংকট এবং ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল ও আশপাশের এলাকায় ইউএনআরডব্লিউএর কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংস্থাটি এখন প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।
প্রায় তিন বছর ধরে যুদ্ধের মধ্যে বেড়ে উঠলেও লায়ান তার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেয়নি। উদ্যমী এই কিশোরী বলেছে, ‘আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো পৃথিবীর অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপন করা। আমি একটি আর্ট একাডেমি খুলতে চাই, যেখানে শিশুদের ছবি আঁকা শেখাব এবং তারা যেন নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে ও যুদ্ধের ভয় কাটিয়ে উঠতে পারে, সেই সুযোগ করে দেব।’
পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কষ্টে থাকা শিশুদের প্রতিও তার বার্তা সমান আন্তরিক। তাঁর বার্তা হলো—‘আমি তাদের বলতে চাই, শক্ত থাকো, কখনও আশা হারিয়ো না এবং সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। ভালো দিন অবশ্যই আসবে।’
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, গাজার ২১ লাখ বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ১৯ লাখ মানুষ এখনও বাস্তুচ্যুত। আর প্রায় ৭ লাখ স্কুলপড়ুয়া শিশু টানা প্রায় তিন বছর ধরে নিয়মিত শিক্ষার বাইরে রয়েছে।
বিশ্বনেতাদের সামনে কথা বলার সুযোগ পেলে কী বলবে, এমন প্রশ্নের উত্তরে লায়ানের কণ্ঠে ধরা পড়ে এক শিশুর সরল অথচ গভীর আবেদন। তিনি বলেছে, ‘আমি তাদের বলব—গাজা ও এখানকার মানুষের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। আমরা নির্দোষ। এত দিন আমাদের একা ফেলে রাখলেন কেন? দয়া করে আমাদের কথা শুনুন এবং শুধু শান্তিতে বাঁচতে চায় এমন শিশুদের রক্ষা করুন।’
যুদ্ধ তার জীবনকে কতটা বদলে দিয়েছে, সে কথাও অকপটে জানায় লায়ান। ‘সবকিছু বদলে গেছে। আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, আমাদের অনেক স্বপ্ন ভেঙে গেছে। এমনকি আমার বাবার চাকরিটাও চলে গেছে, যেটিই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র ভরসা। ইউএনআরডব্লিউএ থেকে অন্যায়ভাবে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’
তবু সে থেমে যায়নি। তার ভাষায়, ‘এত কিছুর পরও আমি ছবি আঁকা চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ শিল্প আমাকে আশা দেয় এবং আমাদের গল্প পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।’
বিশ্ববাসীর উদ্দেশে শেষবারের মতো লায়ানের আবেদন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু গভীর। তার সহজ বার্তাটি হলো, ‘দয়া করে গাজার আসল চিত্রটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে সাহায্য করুন। যারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আমাদের সমর্থন করছেন এবং আমাদের গল্প বাঁচিয়ে রেখেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আপনাদের এই মানবিকতা আমাদের আশা জোগায়।’
যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে হওয়া চুক্তির আওতায় ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে অন্তত ১ হাজার ২০৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ৩ হাজার ৯০০ জন আহত হয়েছেন।