হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

পুলিশি হেফাজতে যুবকের মৃত্যু, বাহরাইনে শিয়া-সুন্নিদের রাজতন্ত্রবিরোধী বিক্ষোভ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মোহাম্মদ আল মোসাভির জানাজায় অংশগ্রহণকারী জনতা। ছবি: সংগৃহীত

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে যুবকের মৃত্যু এবং তাঁকে নির্যাতনের ঘটনা পারস্য উপসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনে ব্যাপক বিক্ষোভ-প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। নিহত ওই যুবক মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তেহরানের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করায় তাঁকে আটক করা হয়। লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

খবরে বলা হয়েছে, ৩২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-মোসাভি ১৯ মার্চ রমজানের শেষ দিকে বন্ধুদের সঙ্গে সেহরি খেতে বেরিয়েছিলেন। বাহরাইন ইনস্টিটিউট ফর রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (বার্ড) তথ্যমতে, একটি চেকপয়েন্টে মোসাভি ও তাঁর ছয় বন্ধুকে কর্তৃপক্ষ আটক করে। এরপর তাঁদের ‘গুম’ করে রাখা হয় এবং পরিবারের কাছে তাঁদের অবস্থান বা পরিণতি সম্পর্কে কোনো তথ্য ছিল না।

গত শুক্রবার মোসাভির পরিবারকে বাহরাইন ডিফেন্স ফোর্সের হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ সংগ্রহ করার জন্য ফোন করা হয়। মিডল ইস্ট আই (এমইই) মোসাভির মরদেহের যে ছবি ও ভিডিও দেখেছে, তাতে তাঁর মুখে ও শরীরে কালশিটে ও আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। বিক্ষোভকারীদের দাবি, মৃত্যুর আগে তাঁকে প্রচণ্ড নির্যাতন করা হয়েছে।

তবে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, এ বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত জখমের ছবিগুলো ‘ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর।’ তারা আরও জানায়, মোসাভিকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে আটক করেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি হামলার উদ্দেশ্যে ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছিলেন।

বার্ডের তথ্য অনুযায়ী, মোসাভি এর আগে কুখ্যাত জাও কারাগারে ১০ বছরের বেশি সময় রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে কাটান। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাহরাইনের রাজা হামাদ বিন ঈসা আল খলিফা যখন শত শত রাজনৈতিক বন্দীসহ ১ হাজার ৫০০ জনের বেশি কয়েদিকে ক্ষমা করেন, তখন তিনি মুক্তি পেয়েছিলেন।

মিডল ইস্ট আই মোসাভির মৃত্যুসনদের একটি অনুলিপি হাতে পেয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি ২৭ মার্চ রাত ২টা ২৯ মিনিটে সামরিক হাসপাতালে মারা যান। মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘কার্ডিওপালমোনারি অ্যারেস্ট’ এবং ‘অ্যাকিউট করোনারি সিনড্রোম’ (হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়া) উল্লেখ করা হয়েছে।

বার্ডের পরিচালক সাইয়্যেদ আলওয়াদাই মোসাভির পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা তাঁকে ‘তরুণ, সুস্থ ও প্রাণবন্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আলওয়াদাই বলেন, ‘তাঁকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে।’ মোসাভির সঙ্গে নিখোঁজ হওয়া অন্যদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা এখনো জানা যায়নি।

এদিকে এক মাস আগে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধের জবাবে ইরান বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দ্বীপজুড়ে সরাসরি আঘাত এবং ধ্বংসাবশেষ থেকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে। এতে অন্তত তিনজন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন।

যুদ্ধের সমান্তরালে বাহরাইন কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ দমনপীড়ন শুরু করেছে। বার্ডের নথি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ২২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুমের ঘটনার কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কিছু গ্রেপ্তার বিক্ষোভের সঙ্গে জড়িত থাকলেও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া বা ইরানি হামলার ভিডিও প্রচারের কারণে আটক হয়েছেন। মোসাভি সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হেফাজতে মারা যাওয়া প্রথম ব্যক্তি।

গত শুক্রবার মুহারাখ শহরে তাঁর জানাজায় শত শত মানুষ অংশ নেন এবং সরকারবিরোধী স্লোগান দেন। তাঁরা ‘আমরা কখনো অপমানিত হব না’, ‘হামাদের পতন চাই’ এবং ‘তোমার ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক’ বলে স্লোগান দেন। বাহরাইনে ভিন্নমত ও বাক্‌স্বাধীনতার ওপর কঠোর বিধিনিষেধের কারণে এই ধরনের স্লোগান ও প্রতিবাদ বিরল।

নিরাপত্তার খাতিরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানাজায় আসা একজন বলেন, ‘গতকাল আমি আমার সাবেক জেল-সঙ্গীর জানাজায় অংশ নিয়েছি, যার সঙ্গে আমি ১০ বছর কাটিয়েছি। দমনপীড়ন সত্ত্বেও স্লোগানগুলো প্রতিরোধের এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ ছিল।’

মানবাধিকার সংগঠনগুলো জানিয়েছে, এই গণগ্রেপ্তারের মূল লক্ষ্যবস্তু হয়েছে শিয়া সম্প্রদায়। বাহরাইনের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ শিয়া, যারা মূলত বাহারনা ও আজম নৃগোষ্ঠীর। অন্যদিকে দেশটির শাসক আল খলিফা পরিবার সুন্নি মতাবলম্বী। মার্চের শুরুতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির মৃত্যুর প্রতিবাদ ও শোক মিছিলে বাহরাইনে বিশাল জনসমাগম দেখা গিয়েছিল। খামেনি বিশ্বের অনেক শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

জানাজায় আসা অপর একজন বলেন, মোসাভির মৃত্যু শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমরা ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে আছি। যেকোনো সময়, যেকোনো স্থানে, চেকপয়েন্টে আপনাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আপনার বাড়িতে অভিযান চালানো হতে পারে। কোনো কারণ ছাড়াই আপনাকে আটকে রেখে গুম করে ফেলা হতে পারে এবং হঠাৎ আপনার পরিবার আপনার প্রাণহীন দেহ খুঁজে পাবে।’

বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর অবস্থিত, যেখানে ৯ হাজারের বেশি আমেরিকান সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। এটি জনশক্তির দিক থেকে এই অঞ্চলে দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি। অনেক বাহরাইনি মনে করেন, এই ঘাঁটির উপস্থিতি দেশে সংঘাত ডেকে আনছে। তারা আরও বিশ্বাস করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে বাহরাইনের রাজপরিবারকে টিকিয়ে রেখেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর উপস্থিতি দেশটিতে কয়েক দশক ধরে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৭৫ সালে দেশটির আইনসভা গঠনের মাত্র দুই বছর পর তা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। কারণ, সেটি দ্বীপে মার্কিন নৌবাহিনীর উপস্থিতির বিরোধিতা করেছিল। এরপর টানা ২৫ বছর জরুরি ডিক্রির মাধ্যমে দেশ শাসিত হয়।

মার্কিন নৌবাহিনীর প্রতি স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতা এখনো শেষ হয়নি। ২০২৪ সালে পঞ্চম নৌবহর এবং ইসরায়েলের সঙ্গে বাহরাইনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরুদ্ধে বিশাল মিছিল হয়েছিল। প্রতি কয়েক বছর পরপরই বাহরাইনে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়, যার মধ্যে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এবং ২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থান উল্লেখযোগ্য। কর্তৃপক্ষ উভয় আন্দোলনই সহিংসভাবে দমন করেছিল।

অনেকে মনে করেন, মোসাভির শরীরে আঘাতের চিহ্নসহ মরদেহ ফেরত দেওয়াটা সরকারের একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, যাতে সাধারণ মানুষের মনে ভীতি সৃষ্টি করা যায়। জানাজায় অংশ নেওয়া এক নারী বলেন, ‘বার্তাটি পরিষ্কার: সরকার এই শহীদের মাধ্যমে সতর্ক করছে যেন কেউ প্রতিবাদ না করে বা কথা না বলে। সরকার এমন এক নীরব জনগোষ্ঠী চায় যারা কিছু দেখবে না, কিছু শুনবে না এবং কিছু বলবে না।’

কূটনীতির আড়ালে স্থল অভিযানের ছক আঁকছে যুক্তরাষ্ট্র: ইরানের স্পিকার

বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা: দায়ী দুই মার্কিন সেনা কর্মকর্তার ছবি প্রকাশ করল ইরান

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের শর্ত তালিকায় নতুন সংযুক্তি, টোলের স্বীকৃতি চায় তেহরান

ভেঙে পড়ার পথে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনী—সেনাপ্রধানের সতর্কবার্তা

সৌদিতে ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের ‘উড়ন্ত মস্তিষ্ক’, এর কাজ কী

মধ্যপ্রাচ্যের ৩ দেশের আকাশ সুরক্ষায় সহায়তা দেবে ইউক্রেন, বিলিয়ন ডলারের চুক্তি

ইরানে ‘কয়েক সপ্তাহ’ অভিযানে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র, চলতে পারে ‘কয়েক মাসও’

মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে ৩৫০০ মার্কিন মেরিন-নাবিক, ইরান বলছে—কফিন প্রস্তুত

হরমুজ প্রণালির চাবিকাঠি ইরানের ৭ দ্বীপ, মার্কিন অভিযানের নতুন সমীকরণ

ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় একজোট ইউক্রেন-কাতার-আমিরাত