প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদারের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি একটি রেডিওভিত্তিক সীমান্ত বেড়া অতিক্রম শনাক্তকরণ (ফেন্স ব্রিচ ডিটেকশন) ব্যবস্থা পরিদর্শন করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গতকাল শনিবার তিনি এই ব্যবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সীমান্তের বেড়ায় কোনো ধরনের ভাঙচুর বা কারসাজি হলেই এই প্রযুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) সদস্যদের সতর্কবার্তা পাঠায়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এটি ছিল অমিত শাহর প্রথম সরেজমিন পর্যালোচনা। এই পরিদর্শন ছিল তাঁর তিন দিনের পশ্চিমবঙ্গ সফরের অংশ। সফরকালে তিনি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক এবং সীমান্ত অবকাঠামো-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন করছেন।
রেডিওভিত্তিক স্মার্ট ফেন্সিং ব্যবস্থা ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তজুড়ে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি মোতায়েনের সরকারি পরিকল্পনার অংশ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের বেড়ায় কোনো ধরনের ভাঙন বা কারসাজি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই ব্যবস্থা পূর্বে রেকর্ড করা একটি সতর্কবার্তা সম্প্রচার করে, যার ফলে বিএসএফ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।
সফরের সময় অমিত শাহ দুর্গম এলাকা, বিশেষ করে নদীবেষ্টিত অঞ্চল এবং সীমান্তের যেসব অংশে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে বেড়া নির্মাণ সম্ভব হয়নি, সেখানে ব্যবহারের জন্য তৈরি ইনফ্রারেড অ্যালার্ম ব্যবস্থাও পর্যালোচনা করেন। এই ব্যবস্থায় ইনফ্রারেড রশ্মি বাধাগ্রস্ত হলেই নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়। পশ্চিমবঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ২ হাজার ২১৬ দশমিক ৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার নদীবেষ্টিত এলাকা হওয়ায় সেখানে ভৌত সীমান্ত বেড়া নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।
ভারত সরকারের এক মুখপাত্র জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি গেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমও পর্যালোচনা করেছেন, যা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ ও কৃষকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরদারি জোরদার, অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ এবং বিএসএফের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্মার্ট সীমান্ত গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
সফরকালে অমিত শাহ ভার্চুয়ালি বিএসএফের ৪৭ কোটি রুপি ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন তিনটি অবকাঠামো প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। একই সঙ্গে নতুন অধিগ্রহণ করা জমিতে দুটি সীমান্ত চৌকির (বর্ডার আউটপোস্ট) জন্য ৩০ কোটি রুপি ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বেড়া নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করেন।
শিলিগুড়িতে বিএসএফ সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে অমিত শাহ বলেন, মোদি সরকারের লক্ষ্য একটি চতুষ্কোণ নিরাপত্তা গ্রিড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতের সীমান্তকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও দুর্ভেদ্য করে তোলা। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘মাদক পাচার, অর্থনৈতিক অপরাধ এবং সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদি সরকার শূন্য সহনশীলতার নীতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অবকাঠামো প্রকল্পগুলো এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে এখানে একটি চতুষ্কোণ নিরাপত্তা গ্রিড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সীমান্তকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও দুর্ভেদ্য করে তোলা হবে।’
অমিত শাহ এর আগে জানিয়েছিলেন, কেন্দ্র সরকার শিগগিরই একটি নতুন সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করবে, যেখানে শুধু সীমান্তরক্ষী বাহিনী নয়, স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ এবং প্রশাসনকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বামপন্থী উগ্রবাদ দমনে সাফল্য অর্জনের পর বর্তমানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুটি বড় প্রকল্পে কাজ করছে। একটি হলো ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে মাদকমুক্ত করা এবং অন্যটি হলো সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করে ভারতের সীমান্তকে দুর্ভেদ্য করে তোলা। পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের কারণে সৃষ্ট জনমিতিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা এবং তা মোকাবিলার উপায়ও খুঁজে দেখা হচ্ছে।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার দেশের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তজুড়ে ভূগর্ভস্থ রাডার ব্যবস্থা, অ্যান্টি-ড্রোন প্রযুক্তি এবং উন্নত ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থা স্থাপন করছে।