বাংলাদেশ সংলগ্ন ভারতীয় রাজ্য আসামের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় জয় লাভ করে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। জয়ের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা লিখেন, ‘সেঞ্চুরিসহ হ্যাটট্রিক।’ এদিন, বিজেপির জোট আসাম বিধানসভার ১২৬ আসনের মধ্যে ৯২ টিতে জয়লাভ করে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের জোট যেসব আসনে জয়লাভ করেছে তার প্রায় শতভাগ মুসলিম প্রধান এলাকার।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ডেকান হেরাল্ডের খবরে বলা হয়েছে, এইবার নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের মিত্ররা টানা তৃতীয়বারের মতো আসাম বিধানসভা নির্বাচনে জয় পেল। এবার ১২৬ সদস্যের বিধানসভায় জোটটি ৯২টি আসন জিতেছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী কয়েক মাস আগেই নিজের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি আরও দুটি পূর্বাভাস দেন। এক পূর্বাভাসে তিনি ইঙ্গিত দেন, বিরোধী দল কংগ্রেস মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের মধ্যে মাত্র ২০-২২টি জিতবে। দুই, বদরুদ্দিন আজমলের নেতৃত্বাধীন এআইইউডিএফ আসামের রাজনীতি থেকে ‘মুছে যাবে।’
সোমবারের রায় প্রায় হুবহু সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে মিলে গেছে। কংগ্রেস মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকার ১৮টি আসন জিতেছে, আর গৌরব গগৈ-এর নেতৃত্বে আরও একটি আসন পেয়েছে। গত ২৫ বছরে রাজ্যটিতে এটি দলটির সবচেয়ে খারাপ ফল। এআইইউডিএফও তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে, জিতেছে মাত্র দুটি আসন।
অন্যদিকে, বিজেপির আসনসংখ্যা ২০২১ সালের ৬০ থেকে বেড়ে এবার ৮২ হয়েছে। তাদের আঞ্চলিক মিত্র অসম গণপরিষদ এবং বোডোল্যান্ড পিপলস ফ্রন্টও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, প্রত্যেকেই ১০টি করে আসন পেয়েছে।
এই রায়ের অর্থ শুধু এটুকুই নয় যে আসাম এখন সেই অল্প কয়েকটি রাজ্যের একটি, যেখানে গেরুয়া শিবির টানা তৃতীয়বার ক্ষমতা ধরে রেখেছে (যেমন গুজরাট)। এটি একই সঙ্গে শর্মার নেতৃত্ব ও নির্বাচনী কৌশলের ওপর এক ধরনের জনসমর্থনের সিলমোহরও দিয়েছে।
অনেকেই এই নির্বাচনকে শর্মার নেতৃত্বের পরীক্ষা হিসেবে দেখেছিলেন, কারণ এটি ছিল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম বড় নির্বাচন। ফল ঘোষণার পর শর্মা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতাম যে এনডিএ জোট ১০০-এর বেশি আসন পেতে পারে। আমরা যে উন্নয়নমূলক কাজ করেছি, নরেন্দ্র মোদি-র আশীর্বাদ ও আসামের প্রতি ভালোবাসার কারণে মানুষ আমাদের হৃদয় উজাড় করে আশীর্বাদ দিয়েছেন।’
বিজেপির অনেকের বিশ্বাস, তথাকথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ বিরুদ্ধে শর্মার কঠোর অবস্থান দলটিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও সনাতনী হিন্দুদের মধ্যে সমর্থন একত্র করতে সাহায্য করেছে, যা কংগ্রেস ও এআইইউডিএফের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এক বিজেপি নেতা বলেন, ‘অসমিয়া সম্প্রদায়, আদিবাসী ও বাঙালি হিন্দুরা যেভাবে আমাদের ভোট দিয়েছে, তা দেখেই বোঝা যায়—বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে শর্মার কঠোর অবস্থানের প্রতি তাদের সমর্থন আছে।’
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালে প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই শর্মা সরকার বনাঞ্চল ও অন্যান্য সরকারি জমি থেকে বহু বাংলা-ভাষী মুসলিমকে উচ্ছেদ করেছে। একই সঙ্গে তথাকথিত ‘অবৈধ অভিবাসী’দের বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে তিনি ‘পুশ ব্যাক’ (যা বাংলাদেশের দিক থেকে পুশ–ইন হিসেবে দেখা হয়) নীতিও গ্রহণ করেছেন। এর পাশাপাশি তিনি কংগ্রেস থেকে নেতাদের বিজেপিতে টানতে থাকেন, যাদের মধ্যে অনেকেই ২০১৫ সালে গেরুয়া দলে যোগ দেওয়ার আগে তাঁর সহকর্মী ছিলেন।
সোমবার শর্মা কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের উদ্দেশে আহ্বান জানান, ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আগামী লড়াইকে শক্তিশালী করুন।’ তবে তিনি দ্বিতীয় দফায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন কি না—এই প্রশ্নে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।