হিন্দু ধর্মগ্রন্থ মনুস্মৃতি, বেদ ও অন্যান্য শাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে গরুর ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরে গরু জবাইয়ের মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন ভারতের গুজরাটের একটি আদালত। ২৭৭ কেজি গরুর মাংস উদ্ধারের ঘটনায় তাঁদের এই সাজা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেককে জরিমানাও করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, গত সোমবার গুজরাটের গান্ধীনগর জেলার অতিরিক্ত দায়রা জজ বি আর রাজপুত এ রায় ঘোষণা করেন। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন—ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি ও আসফাক বাহেলিম। তাঁদের প্রত্যেককে ৩ লাখ রুপি জরিমানা করা হয়েছে।
রায়ে মনুস্মৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে বিচারক বলেন, ‘গরু কেবল একটি প্রাণী নয়; বরং বস্তুগত সমৃদ্ধি ও ধর্মীয় ন্যায়পরায়ণতার অন্যতম ভিত্তি। ঋষি মনু গবাদিপশুর সুরক্ষা ও পরিচর্যার প্রধান দায়িত্ব বৈশ্য সম্প্রদায়ের ওপর অর্পণ করেছিলেন। এ ছাড়া বৈদিক বিবাহের একটি প্রাচীন রীতি ‘আর্শ বিবাহ’-এর ক্ষেত্রেও গরু ও ষাঁড়ের জুটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।’
বেদসহ অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে আদালত আরও বলেন, ‘তপস্যার শক্তিতে পৃথিবীতে অমৃতের ফোঁটা পতিত হলে সেখান থেকে দিব্য গাভি কামধেনুর আবির্ভাব ঘটে। তাঁকে পৃথিবীর সব গোবংশের আদি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’ বিচারকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গরুকে ‘জগতের জননী’ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তিনি ৩৩ কোটি দেবতার আবাসস্থল। গরুর চারটি পা চারটি বেদের প্রতীক বলেও উল্লেখ করেন বিচারক।
রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট গান্ধীনগর জেলার জামলা গ্রামের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে ২৭৭ কেজি গরুর মাংস, পশু জবাইয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র এবং মাংস পরিবহনের জন্য একটি যান উদ্ধার করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, বাবা ও ছেলের একটি জুটি দুর্বল কিংবা দুধ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে, এমন গরু কিনত। পরে আহমেদাবাদ থেকে চার ব্যক্তিকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এসে পশুগুলো ‘নিষ্ঠুরভাবে’ জবাই করাত তারা। আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যেই এ কাজ করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়।
তদন্তে আরও উঠে আসে, অভিযুক্তদের পরিকল্পনা ছিল গরুর মাংস গুলাম মইন নামের এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা। মামলার বিচার শেষে ছয় অভিযুক্তের মধ্যে তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত। অভিযোগ প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ৫৪ জন সাক্ষীকে হাজির করে এবং ১৮টি দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করে।
এদিকে রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন গুজরাটের উপমুখ্যমন্ত্রী হর্ষ সাংঘভি। গান্ধীনগর পুলিশ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নির্ভুল তদন্ত এবং শক্তিশালী তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের’ কারণেই এই সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘গুজরাট পশু সংরক্ষণ আইনের অধীনে দেওয়া এই রায় স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, গুজরাটে গরু জবাইয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইন কখনোই ছাড় দেবে না। গো-মাতার সুরক্ষা গুজরাটের অবিচল অঙ্গীকার।’
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে গুজরাট সরকার ১৯৫৪ সালের গুজরাট পশু সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে গরু জবাইয়ের অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান যুক্ত করে। এর মধ্য দিয়ে গরু জবাইয়ের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান চালু করা ভারতের প্রথম রাজ্যে পরিণত হয় গুজরাট।
এ ছাড়া রাজ্য বিধানসভায় অনুমোদিত গুজরাট পশু সংরক্ষণ (সংশোধনী) বিলে গরুর মাংস পরিবহন, সংরক্ষণ ও বিক্রির অপরাধে ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর আগে ২০১১ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে রাজ্যে গরু জবাই, গরুর মাংস পরিবহন ও বিক্রির ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল তাঁর সরকার।