পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বিষয়টি বয়স নিয়ে নয়, বিষয়টি হলো কতটা পথ পেরিয়েছেন তা নিয়ে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ যখন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি নিয়ে আলোচনা করছেন, তখন এই ক্ষুরধার রাজনীতিক পাল্টা জানিয়েছেন, তাঁর ভেতরে এখনও যথেষ্ট শক্তি ও উদ্যম রয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর দলত্যাগের ধাক্কায় বিপর্যস্ত তৃণমূল কংগ্রেসকে তিনি আবারও নতুন করে গড়ে তুলতে পারবেন বলে দাবি করেছেন।
মনে হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেন নিজের ভেতরের ইন্ডিয়ানা জোনস সত্তাকেই সামনে নিয়ে এসেছেন। সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এখনও লড়াই করার মতো যথেষ্ট সক্ষম এবং বিজেপি শাসনের অবসান নিজের চোখে দেখেই তিনি বিদায় নেবেন।
সমালোচকদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে ৭১ বছর বয়সী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফেসবুকে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘আমার বয়স নিয়ে আপনাদের চিন্তা করার দরকার নেই। মন, শরীর আর মানসিক শক্তিই মানুষের বয়স নির্ধারণ করে। আমি কি কখনও প্রধানমন্ত্রীর বয়স নিয়ে প্রশ্ন করেছি? বয়স নিয়ে কাউকে অপমান করার সাহস দেখাবেন না। বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন বিজেপির লোকজন চেয়েছিল আমি যেন হার্ট অ্যাটাকে মারা যাই। কিন্তু আমি বেঁচে থাকব, যতদিন না তোমাদের পতন নিজের চোখে দেখি।’
বয়সকে প্রত্যাবর্তনের পথে কোনো বাধা হিসেবে মানতে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিনি আগের মতোই আবারও দলকে নতুন করে গড়ে তুলবেন। তিনি বলেন, ‘যাঁদের যেতে ইচ্ছা, তাঁরা চলে যেতে পারেন। যা থাকবে, সেটাই আমার সোনার খনি। ২০০৪ সালে যেমন একা শুরু করেছিলাম, ১৯৯৭ সালেও যেমন করেছিলাম, ঠিক তেমনভাবেই ২০২৬ সালে আবার নতুন করে শুরু করার শক্তি আমার আছে। সেই সাহস আমার রয়েছে। আমি এক নয়, তিন প্রজন্মের নেতা তৈরি করেছি এবং এখন যারা আমার সঙ্গে আছে, সেই তিন প্রজন্মের জন্য আমি ছাতার মতো আশ্রয় হয়ে থাকব।’
সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা করছেন না জানিয়ে বলেন, ‘করব, লড়ব, বাঁচব।’ বর্তমানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দলের ভেতরে নজিরবিহীন বিদ্রোহের মুখোমুখি। এই বিদ্রোহের ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই শিথিল হয়ে পড়েছে। রাজ্য বিধানসভা ও সংসদ, উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর নির্বাচিত অধিকাংশ বিধায়ক ও সাংসদ বিদ্রোহ করেছেন। অধিকাংশ বিধায়ক বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অন্যদিকে, লোকসভার ২০ জন তৃণমূল সাংসদ একটি তুলনামূলকভাবে অল্প পরিচিত রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়ে এনডিএকে সমর্থনের ঘোষণা দিয়েছেন।
বুধবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগঘন এই বার্তা আসে তৃণমূল কংগ্রেসের ২১ জুলাইয়ের শহীদ দিবসের সমাবেশের কয়েক দিন আগে। দলটির রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এ বছর একই দিনে দলের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বে পৃথকভাবে শহীদ দিবস পালন করবে।
গতকাল বুধবার কলকাতা হাইকোর্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) গোষ্ঠীকে মধ্য কলকাতার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনের ঐতিহ্যবাহী স্থানের পরিবর্তে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের কাছাকাছি একটি স্থানে বার্ষিক ২১ জুলাই শহীদ দিবসের সমাবেশ আয়োজনের অনুমতি দেয়। শহীদ দিবসের এই সমাবেশ ১৯৯৩ সালে এক বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় নিহত ১৩ জন কংগ্রেস কর্মীকে স্মরণ করে অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেসের যুব সংগঠন যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী ছিলেন। পরবর্তীতে এই কর্মসূচিই তৃণমূল কংগ্রেসের বার্ষিক শহীদ দিবসের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।