ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ভারতজুড়ে শোকসভা, প্রার্থনা এবং বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ভারতের শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই কালো পোশাক পরে মসজিদ ও জনসমাগমস্থলে জড়ো হয়ে প্রার্থনা করেছেন, মোমবাতি জ্বালিয়েছেন এবং নিহত নেতার স্মরণে শোকসভা আয়োজন করেছেন।
৮৬ বছর বয়সী খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে তার প্রধান কম্পাউন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হন বলে জানা যায়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার পর এই হামলা চালানো হয়। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা খামেনি ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়িয়েছিলেন। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে কঠোরভাবে বিরোধিতা দমনের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
বিশ্বজুড়ে তাঁর মৃত্যু নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও ভারতের বহু শিয়া মুসলমানের কাছে তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, বরং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবেও বিবেচিত ছিলেন। ফলে তাঁর হত্যাকাণ্ডকে অনেকেই গভীর শোকের সঙ্গে দেখছেন।
দিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক শোকসভায় অংশ নেওয়া ৫৮ বছর বয়সী রজব আলী বলেন, ‘আমি এবার ঈদ উদ্যাপন করব না। খামেনি ছিলেন আমাদের রাহবার বা পথপ্রদর্শক। আনন্দের সময়ই তো ঈদ পালন করা হয়। এখন আমরা কীভাবে আনন্দ করব?’ তিনি জানান, তাঁদের পরিবারে এবার নতুন পোশাক কেনা বা অতিথি আপ্যায়নের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে।
খামেনির মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন মুসলিম বিশ্বে রমজান মাস চলছে এবং সামনে ঈদ। ফলে অনেকের মতে, এই ঘটনাটি ধর্মীয় অনুভূতিকে আরও গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
ভারতের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে শোকসভা ও বিক্ষোভের ঘটনা কাশ্মীর থেকে শুরু করে দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেছে। দিল্লির একটি মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বড় বড় ব্যানারে খামেনির ছবি টাঙানো ছিল। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন পুরুষ তাঁর স্মরণে গান গেয়েছেন এবং কোরআন পাঠ করেছেন। অনেক নারীকে নীরবে কান্না করতেও দেখা গেছে।
দিল্লির অবসরপ্রাপ্ত গবেষক ড. মুহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে যেন আবার অনাথ হয়ে গেলাম। শেষবার এমন অনুভূতি হয়েছিল যখন আমার বাবা-মা মারা গিয়েছিলেন। এখন মনে হচ্ছে পুরো শিয়া সম্প্রদায় যেন অনাথ হয়ে গেছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিয়া ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা রয়েছে যার নাম ‘ভেলায়েত-ই-ফকিহ’ বা ‘ফকিহের অভিভাবকত্ব’। এই ধারণা অনুযায়ী একজন জ্যেষ্ঠ ইসলামি আলেম রাষ্ট্রের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেবেন। ভারতের জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মুদ্দাসির কুমারের মতে, এই ধারণার কারণেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা অনেক শিয়া মুসলমানের কাছে আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বও বহন করেন।
তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বহু শিয়া মুসলমান ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখেন। তাই তার হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে আবেগের জন্ম দিয়েছে।’
তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরাসরি কোনো কঠোর মন্তব্য করেননি। খামেনির মৃত্যুর চার দিন পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে শোকবার্তা পাঠায়। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি দিল্লিতে ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ভারতের জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে সমবেদনা জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী। তাই সরকার বিষয়টিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ভারতের জন্য শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি তার প্রায় ৫০ শতাংশ তেল আমদানি করে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। এ ছাড়া প্রায় এক কোটি ভারতীয় নাগরিক উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করেন এবং তাঁরা দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। ফলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ভারতের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তা চাপের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে ভারত মহাসাগরে সাম্প্রতিক এক সামরিক ঘটনার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীর এক মহড়ায় অংশ নিয়ে দেশে ফেরার পথে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ডুবে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণে এই ঘটনায় অন্তত ৮৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনার পর ভারত সরকার প্রকাশ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া না দেখানোয় সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের কৌশলগত অবস্থানকে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিরা বলছেন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের সম্পর্ক দৃঢ় রয়েছে। ইরানের এক প্রতিনিধি জানান, খামেনি নিজেও বহুবার ভারতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন এবং দুই দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভারতে যে বিক্ষোভ ও শোকসভা হয়েছে তা মূলত শিয়া অধ্যুষিত এলাকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং বড় কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত কীভাবে এগোয়, তার ওপর পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।