নারীর মর্যাদা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। মাসিককালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতাকে সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। ঐতিহাসিক এই রায়ে আদালত বলেছেন, মাসিককালীন স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের ‘জীবনের অধিকার’ ও ‘গোপনীয়তার অধিকারে’র অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজ শুক্রবার বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা ও বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ এই রায় দেন। স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের জন্য বিনা মূল্যে স্যানিটারি প্যাড ও যথাযথ স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত চেয়ে করা এক আবেদনের শুনানি শেষে তাঁরা কেন্দ্র, রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও সব স্কুলের জন্য বাধ্যতামূলক এ নির্দেশনা জারি করেন।
রায়ে বলা হয়েছে, দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে ছাত্রীদের জন্য বিনা মূল্যে পরিবেশবান্ধব (বায়োডিগ্রেডেবল) স্যানিটারি ন্যাপকিন সরবরাহ করতে হবে।
রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি পারদিওয়ালা বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত শুধু আইনজগতের অংশীজনদের জন্য নয়। এটা সেই শ্রেণিকক্ষগুলোর জন্য, যেখানে মেয়েরা সাহায্য চাইতে লজ্জা পায়। সেই শিক্ষকদের জন্য, যারা সাহায্য করতে চান কিন্তু সম্পদের অভাবে পারেন না। আমরা কতটা অগ্রসর, তা বোঝা যায় আমরা দুর্বলদের কতটা সুরক্ষা দিতে পারি।’
একই সঙ্গে প্রতিটি স্কুলে ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেট নিশ্চিত করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, এ নির্দেশ মানা সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের জন্য বাধ্যতামূলক। কোনো প্রতিষ্ঠান আলাদা টয়লেট বা বিনা মূল্যে স্যানিটারি প্যাডের ব্যবস্থা না করলে তাদের স্বীকৃতি বাতিলও করা হতে পারে।
বেঞ্চ মন্তব্য করেছেন, মাসিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো দয়া বা নীতিনির্ধারকদের ইচ্ছাধীন বিষয় নয়; এটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন ও সাংবিধানিক অধিকার।
রায়ে আরও বলা হয়, মৌলিক এসব সুবিধা দিতে ব্যর্থ হলে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। কারণ, মাসিক নিয়ে কুসংস্কার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব সরাসরি মেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
উল্লেখ্য, এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল গত বছর নভেম্বরে হরিয়ানার মহর্ষি দয়ানন্দ ইউনিভার্সিটির একটি ন্যক্কারজনক ঘটনার মাধ্যমে। সেখানে তিনজন নারী পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে তাঁদের পিরিয়ড চলছে কি না তা প্রমাণ করতে ব্যবহৃত স্যানিটারি প্যাডের ছবি পাঠাতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ঘটনা ভারতজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি আমলে নেন।
তখন বিচারপতি বি ভি নাগারত্না ও আর মহাদেবনের বেঞ্চ মন্তব্য করেছিলেন, এ ধরনের আচরণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগজনক মানসিকতার প্রতিফলন। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের (এসসিবিএ) করা আবেদনে বলা হয়, এ ধরনের ‘তল্লাশি’ নারীদের জীবন, মর্যাদা, গোপনীয়তা ও শারীরিক অখণ্ডতার অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।
আগের শুনানিতে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছিল, মাসিকজনিত ব্যথার কারণে কোনো নারী ভারী কাজ করতে না পারলে তাঁকে অপমানজনক যাচাইয়ের মুখে না ফেলে বিকল্প কর্মী দিয়ে কাজ করানো উচিত।
বেঞ্চ তখন বলেছিল, ‘কেউ যদি বলে এই কারণে সে ভারী কাজ করতে পারছে না, সেটি মেনে নিয়ে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া যেত।’
হরিয়ানা সরকার আদালতকে জানিয়েছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয় ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সর্বশেষ এই রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট বার্তা দিলেন—মাসিক কোনো লজ্জার বিষয় নয়, এটি স্বাস্থ্য ও মর্যাদার প্রশ্ন; আর সেই মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।