ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নতুন মাত্রা পেয়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে সংবাদ শিরোনামে থাকার পর শনিবার দলটির শত শত সমর্থক নয়াদিল্লিতে জড়ো হয়েছেন। ভারতের সংসদ ভবনের কাছের নির্ধারিত বিক্ষোভ এলাকায় আয়োজিত এই সমাবেশে অংশগ্রহণকারীদের অনেককে তেলাপোকার মুখোশ পরতে দেখা গেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামের অনুকরণে গড়ে ওঠা ককরোচ জনতা পার্টি অল্প সময়েই অনলাইনে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে ভারতের তরুণদের মধ্যে দলটি দ্রুত সমর্থন অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের অনুসারীর সংখ্যা কোটি ছাড়িয়েছে।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত গত মাসে। আদালতের এক শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সরকারবিরোধী সমালোচনাকারী তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর বক্তব্য প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ এবং বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিত দিপকে ওই মন্তব্যকে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগের অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করেন।
এরপর একটি ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট চালুর মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে সিজেপির জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে। শনিবার পর্যন্ত দলটির ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২২ লাখেরও বেশি হয়েছে। তাদের স্লোগান, ‘তরুণদের জন্য, তরুণদের দ্বারা, তরুণদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।’
আজ শনিবারের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সিজেপির আয়োজকেরা সমর্থকদের ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবিতে একত্র হওয়ার আহ্বান জানান। মে মাসে পরীক্ষায় অনিয়মের একটি বিতর্ক দ্রুত ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সীমিত কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেই অসন্তোষই বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সমাবেশে অংশ নেওয়া সিজেপি সমর্থকেরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল, ‘তেলাপোকা আসছে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যাচ্ছে!’ আয়োজকেরা অংশগ্রহণকারীদের ভারতের জাতীয় পতাকা এবং একটি বই সঙ্গে আনার আহ্বান জানান। তাদের ভাষ্য, জাতীয় পতাকা ও বই সবার জন্য শিক্ষা লাভের অধিকার এবং সমান সুযোগের প্রতীক। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণ থাকার এবং পুলিশের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে না জড়ানোর অনুরোধ করা হয়।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার করে ভারতীয় পুলিশ। বিমানবন্দর ও যন্তর মন্তর বিক্ষোভস্থলে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে ইস্পাতের ব্যারিকেড বসানো হয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, সিজেপির উত্থান দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাওয়া একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে জন্ম নেওয়া তরুণদের আন্দোলন শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ককরোচ জনতা পার্টির জনপ্রিয়তাও সেই ধারারই নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেলাপোকাকে এখন টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করছেন সিজেপি সমর্থকেরা। তারা মজা করে নিজেদের ‘বেকার’ এবং ‘সব সময় অনলাইনে থাকা’ মানুষ হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি তরুণ হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। এর ফলে বেকারত্ব বাড়ছে এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি হতাশাও গভীর হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হতাশাই সিজেপির মতো আন্দোলনের প্রতি তরুণদের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
তবে সবাই এই আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না। মোদির দলের কিছু সমর্থক সিজেপিকে নিছক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর একটি প্রচারণা বা কৌশল বলে মনে করছেন। তাদের যুক্তি, অনলাইনে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও সেটি বাস্তব রাজনৈতিক সংগঠন বা রাজপথের শক্তিতে রূপ নাও নিতে পারে। পাশাপাশি তারা মনে করেন, দলটির এই দ্রুত উত্থান শেষ পর্যন্ত ক্ষণস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।