জমির মালিকানা বা রেকর্ডপত্র কোনোভাবেই ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের অভিযোগে আটক হওয়া নাসির মোল্লা নামের এক কথিত বাংলাদেশি নাগরিকের রিট পিটিশন শুনানির সময় আদালত এই মন্তব্য করেন।
বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ তাঁদের দুই পৃষ্ঠার আদেশে জানিয়েছেন, কোনো বিদেশি নাগরিক ভারতে সম্পত্তি ক্রয় করলেই তিনি এ দেশের নাগরিক হয়ে যান না। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আসামের মতো জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) চালুর জোরালো আলোচনার মধ্যেই আজ উচ্চ আদালতের এই পর্যবেক্ষণ এল।
এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশের অভিযোগে নাসির মোল্লা নামের ওই ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি একটি ডিটেনশন সেন্টারে বন্দী আছেন। নাসিরের পক্ষ থেকে তাঁর এক আত্মীয় কলকাতা হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করে দাবি করেন, আটক ব্যক্তি একজন প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক। তবে রাজ্য সরকারের পক্ষে সরকারি কৌঁসুলি আদালতে জানান, আটক হওয়ার পর নাসির মোল্লা নিজেই একজন বিদেশি নাগরিক হিসেবে অনুপ্রবেশ করার কথা স্বীকার করেছেন। এই পরিস্থিতিতে আদালত আবেদনকারী পক্ষকে নাসিরের ভারতীয় নাগরিকত্বের সপক্ষে অকাট্য দালিলিক প্রমাণ হাজিরের নির্দেশ দেন।
আদালতের এমন নির্দেশের পর আবেদনকারীর আইনজীবী স্বীকার করেন, রিট পিটিশনের সঙ্গে যুক্ত থাকা জমির রেকর্ড বা দলিল ছাড়া নাসিরের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করার মতো অন্য কোনো নথি তাঁদের কাছে নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ তাঁদের আদেশে উল্লেখ করেন, ‘একজন বিদেশি নাগরিকও ভারতে স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করতে পারেন। কিন্তু কোনো বিদেশি নাগরিক ভারতে সম্পত্তি কিনেছেন বলেই আইনিভাবে তিনি ভারতীয় নাগরিকত্ব দাবি করতে পারেন না। জমির রেকর্ড বা দলিল কখনোই নাগরিকত্ব প্রমাণের দলিল হতে পারে না।’
তবে মানবিক দিক বিবেচনা করে আদালত আবেদনকারী পক্ষকে আগামী ২০ জুলাই পর্যন্ত আরও একটি শেষ সুযোগ দিয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে হলফনামার (অ্যাফিডেভিট) মাধ্যমে নাসিরের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারে এমন যেকোনো বৈধ সরকারি নথি আদালতে পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ভারতে নাগরিকত্বের প্রমাণ নিয়ে আইনি কড়াকড়ি এটাই প্রথম নয়। গত মাসে ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘পাসপোর্ট’ও ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ নয়। কারণ কারিগরি ও আইনি জটিলতার কারণে অনাবাসিক বা অ-নাগরিকদেরও বিশেষ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট দেওয়া হতে পারে। ২০১৩ সালের একটি মামলায় বোম্বে হাইকোর্টও একই রায় দিয়ে বলেছিলেন, পাসপোর্ট থাকা মানেই কেউ নিশ্চিতভাবে ভারতের নাগরিক—তা বলা যাবে না।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে আসামের মতো এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি চালুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। সম্প্রতি এক জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘আমাদের কিছুটা সময় দিন। পশ্চিমবঙ্গে খুব শিগগিরই ল্যান্ড জিহাদ, লাভ জিহাদ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আনার পাশাপাশি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালু করা হবে।’ এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কলকাতা হাইকোর্টের এই সর্বশেষ রায় রাজ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণ এবং নাগরিকত্বের আইনি লড়াইকে আরও জটিল ও কঠোর করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।