তথাকথিত ‘সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিকদের’ বাংলাদেশে জোরপূর্বক ‘পুশ ইন’ বা ঠেলে পাঠানো নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা চলছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যায়ের মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে ১৪ সদস্যের একটি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) প্রতিনিধিদল গতকাল সোমবার দিল্লিতে পৌঁছেছে। এই বৈঠকে পুশ ইন ইস্যু তোলা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে ভারতের তরফ থেকে আলোচনার অ্যাজেন্ডায় বিষয়টি রাখা হয়নি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, চার দিনব্যাপী এই বৈঠকের অ্যাজেন্ডায় ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কথিত পুশ ইন নীতির বিষয়টি উল্লেখ করেনি। তবে গত রোববার ঢাকা জানায়, ভারতের পুশ ইন এবং সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিষয়গুলো দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানদের মধ্যকার বৈঠকে আলোচনায় আসবে। অর্থাৎ, বিএসএফের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বিষয়টি আমলে নিলে বলা যায়, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চায় না।
এক বিবৃতিতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) জানিয়েছে, ‘সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এবং দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় প্রতিষ্ঠার’ লক্ষ্যে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। বিএসএফের বিবৃতি অনুযায়ী, আলোচনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হাতে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা প্রতিরোধ, আন্তসীমান্ত অপরাধ, বাংলাদেশি অপরাধীদের ভারতে প্রবেশ এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্বারা সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া লঙ্ঘনের বিষয়গুলো উঠে আসবে।
এ ছাড়া সীমান্তে বেড়া নির্মাণ, বাংলাদেশে অবস্থানরত ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সীমান্ত অবকাঠামো-সংক্রান্ত বিষয়ও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু বিবৃতিতে কোথাও পুশ ইনের বিষয়ে উল্লেখ করা হয়নি।
চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। অন্যদিকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিএসএফের মহাপরিচালক প্রবীণ কুমার।
তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত, আটক ও বহিষ্কারের লক্ষ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘ডিটেক্ট ডিটেইন-ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় তথাকথিত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে আইনগত বা কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ না করেই দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ভারতের এই পুশ ইন নীতির বিরুদ্ধে ঢাকা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদও জানিয়েছে। একই সঙ্গে এই পদক্ষেপকে ঘিরে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের হয়রানির অভিযোগও উঠেছে।
গত মাসে ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লিকে জানায়, কোনো ধরনের জোরপূর্বক ও একতরফা প্রত্যাবাসন আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। বাংলাদেশ আরও জানায়, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অবশ্যই কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জাতীয়তা যাচাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সম্পন্ন হতে হবে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ রোববার ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে অবৈধ পুশ ইনের বিষয়টি (বিজিবির পক্ষ থেকে) গুরুত্বের সঙ্গে উত্থাপন করা হবে।’
গত বছর থেকে বিএসএফ বিপুলসংখ্যক অনুপ্রবেশকারীকে বাংলাদেশে পুশ ইন করেছে। বিশেষ করে ভারতের বিজেপিশাসিত রাজ্য আসাম, দিল্লি, গুজরাট, ওডিশা, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র থেকে এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিপরীতে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার কাছে কোনো অনুরোধ পাঠানো হচ্ছিল না। একইভাবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাসপোর্ট না থাকলে তাদের জন্য ভ্রমণ অনুমতিপত্র (ট্রাভেল পারমিট) ইস্যুর প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হচ্ছিল না।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্যের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত।