পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাঙচুর চালিয়েছে বিজেপি ঘনিষ্ঠ ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) সদস্য পরিচয় দেওয়া একদল লোক। ৮ মে ক্যাম্পাসে ঢুকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে ভাঙচুর চালায় তারা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এবিভিপি ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন বিজেপির আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ছাত্রসংগঠন। ঘটনাটি ঘটে ঠিক সেই সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে জয়ের পর বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার এক দিন আগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ কার্যালয়ের ভেতরে টাঙানো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি নামিয়ে ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ। ক্যাম্পাসের অন্য ছাত্রসংগঠনের কর্মীরা জানান, নিজেদের এবিভিপি কর্মী দাবি করা ওই লোকগুলো উপাচার্যের দপ্তরেও ঢুকে পড়ে এবং তাঁকেও জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে চাপ দেয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় এবিভিপির ‘নির্দেশনা’ অনুযায়ী পরিচালিত হতে হবে বলেও তারা হুমকি দেয় বলে অভিযোগ।
ঘটনাটি ঘটার তিন দিন পর, ১১ মে সন্ধ্যায় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর বিদ্যাসাগরের জন্মভূমি মেদিনীপুরজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশনার কারণে পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের মতো বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ কার্যালয়ও বন্ধ। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন কর্মী এই প্রতিবেদককে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবিভিপির কোনো সক্রিয় ইউনিট ছিল না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলাকারীদের মধ্যে সৌম্যদীপ বেরা নামের এক এমবিএ শিক্ষার্থী ছিলেন। তিনি নিজেকে এবিভিপির ছাত্রনেতা পরিচয় দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। কর্মীদের দাবি, তাঁর সঙ্গে এমন কিছু লোকও ছিলেন, যাদের বহিরাগত বলেই মনে হয়েছে।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, একদল লোক ছাত্র সংসদ কার্যালয়ের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। পরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জয়ন্ত কিশোর নন্দী এবং উপাচার্য দীপক কুমার কারের দপ্তরের দিকে মিছিল করে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, বিক্ষোভ চলাকালে দুই শীর্ষ কর্মকর্তার টেবিলে থাকা কাগজপত্র মেঝেতে ছুড়ে ফেলা হয়। উপাচার্যকেও জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে উসকানি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা জানান, ওই লোকগুলো বিদ্যাসাগরের একটি প্রতিকৃতি মাটিতে ছুড়ে ফেলে সেটির ওপর পা দিয়ে মাড়ায়। একই সময়ে তারা উচ্চ স্বরে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে থাকে। কয়েকজন আবার বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রামী ক্ষুদিরাম বসুর কোনো প্রতিকৃতির স্থান থাকবে না। এখন থেকে ক্যাম্পাসে শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ছবিই টানানো হবে।
বিক্ষোভকারীরা আরও দাবি তোলে, সাম্প্রতিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া ২২ শিক্ষার্থীকে পাস ঘোষণা করতে হবে এবং এবিভিপি ছাড়া অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া যাবে না। দ্য ওয়্যারের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজনের দাবি, হামলায় জড়িত কয়েকজন মাত্র কয়েক দিন আগেও তৃণমূল কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
উপাচার্য দীপক কুমার কার এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা জানান, তিনি প্রশাসনের কাছেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের একজনের সঙ্গে দ্য ওয়্যার কথা বলেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দাবিদাওয়া নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিছু উৎসাহী কর্মী স্লোগান দিয়েছে, চিৎকার করেছে, কিন্তু এর বাইরে কিছু ঘটেনি।’