ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ডের হিটন রোডে অবস্থিত জামিয়া উসমানিয়া মসজিদ সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোচিত হচ্ছে। এখানে শুধু নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জামাতই অনুষ্ঠিত হয় না, পাশাপাশি আধুনিক স্বাস্থ্য সচেতনতার এক বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে এই মসজিদ।
প্রবীণ পুরুষদের শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধিতে এই মসজিদ কর্তৃপক্ষের শুরু করা ‘পিলাটিস’ ক্লাসের ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। টিকটক এবং ফেসবুক মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ভিউ পেয়েছে ২০ লাখের বেশি।
বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা ইতিবাচক মন্তব্যের জোয়ারে ভাসছে এই মসজিদ কর্তৃপক্ষ। নেটিজেনদের মতে, একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে আধুনিক সামাজিক সুস্থতার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে, ব্র্যাডফোর্ডের এই উদ্যোগ তার অনন্য উদাহরণ।
কেন এই আয়োজন?
মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি মোহাম্মদ ইলিয়াস এই উদ্যোগের পেছনের গল্প বলতে গিয়ে বিবিসিকে জানান, লক্ষ্যটি ছিল বয়স্ক পুরুষদের একাকিত্ব দূর করা। তিনি বলেন, ‘মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়, একে একটি প্রকৃত কমিউনিটি হাবে রূপান্তর করা আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। অনেক প্রবীণ মানুষ সারা দিন ঘরে টিভির সামনে একা বসে থাকেন। আমরা চেয়েছি তাঁরা মসজিদে আসুন, শরীরচর্চা করুন এবং একে অপরের সঙ্গে কথা বলুন।’
একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়া প্রসঙ্গে ইলিয়াস সবিস্ময়ে বলেন, ‘সত্যি বলতে আমরা রীতিমতো হতবাক। ভিডিওটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে সেটা কল্পনাও করিনি। এখন শুধু প্রশংসা নয়, ইংল্যান্ডের অন্তত এক ডজন মসজিদ থেকে আমার কাছে ফোন এসেছে। তাঁরা জানতে চাচ্ছেন, ঠিক কোন পদ্ধতিতে আমরা এই ক্লাসগুলো পরিচালনা করছি? তাঁরাও তাদের নিজ নিজ মসজিদে এটি চালু করতে চান।’
প্রতি বৃহস্পতিবার আয়োজিত এই ক্লাসে অংশগ্রহণকারীদের বয়স ৫০ থেকে ৮০-র কোঠায়। প্রশিক্ষক জারা কায়ানি, যিনি এই ক্লাসের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বিবিসিকে বলেন, ‘তরুণদের জন্য বডি-বিল্ডিং বা জিমের অনেক সুযোগ থাকলেও আমাদের বড়দের (সিনিয়র সিটিজেন) জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। পিলাটিস তাঁদের পেশির নমনীয়তা বাড়ায়, পিঠের ব্যথা কমায় এবং শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।’
জারা আরও যোগ করেন, ‘এটি কেবল শারীরিক কসরত নয়, এটি একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক মিলনমেলা। এখানে তাঁরা হাসাহাসি করেন, আনন্দ করেন, এটা তাঁদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।’
বদলে যাওয়া জীবন
এই ক্লাসের অন্যতম নিয়মিত মুখ ৬২ বছর বয়সী আবিদ খান। ২০২৪ সালের জুন মাসে তাঁর হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘অপারেশনের পর আমি শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছিলাম। এই পিলাটিস ক্লাস আমাকে কেবল শারীরিকভাবেই নয়, মানসিকভাবেও পুনর্জীবন দান করেছে। এখানে এসে আমি যাদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, তাঁরা এখন আমার প্রাণের বন্ধু।’
৬০ বছর বয়সী হাবিব রেহমান, যিনি দীর্ঘদিনের সায়াটিকা ও কোমরের ব্যথায় ভুগছিলেন, তিনি বলেন, ‘আমি অনেক দিন ধরে এমন কিছু খুঁজছিলাম যা আমাকে ব্যথা থেকে মুক্তি দেবে। এখানে আসার পর অনেক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। ক্লাসের পর সবাই মিলে যখন ফল আর চা-বিস্কুট নিয়ে আড্ডা দিই, তখন ভুলে যাই যে আমাদের বয়স হয়েছে।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ক্লাসটি বর্তমানে এতটাই জনপ্রিয় যে, কোনো রকম বিজ্ঞাপন ছাড়াই কেবল মুখে মুখে শুনে মানুষ এখানে ভিড় করছেন। শুরুর দিকে ৭ জন নিয়ে শুরু হলেও এখন ২৫ জনের বেশি সদস্য হওয়ায় জায়গার অভাবে নতুন ভর্তি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
তবে আশার কথা শুনিয়েছেন মোহাম্মদ ইলিয়াস। তিনি জানান, মসজিদের পাশেই একটি নতুন ভবন নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। সেই নতুন অবকাঠামো তৈরি হয়ে গেলে আরও বড় পরিসরে এই শরীরচর্চা ক্লাস চালানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি, স্থানীয় নারীদের দীর্ঘদিনের অনুরোধে তাঁদের জন্য বিশেষ ‘উইমেনস অনলি’ শরীরচর্চা সেশন এবং সামাজিক কার্যক্রম চালু করার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।
অনেকে বলছেন, ব্র্যাডফোর্ডের এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে মুসলিম কমিউনিটি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল—যেখানে ঐতিহ্য আর আধুনিক স্বাস্থ্য সচেতনতা হাত ধরাধরি করে চলছে।