হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

বিদেশে সমালোচকদের শায়েস্তা করতে ইন্টারপোলের ‘ওয়ান্টেড লিস্ট’ ব্যবহার করছে রাশিয়া

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: এএফপি

আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে ব্যবহার করে বিদেশে থাকা রাজনৈতিক বিরোধী, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের টার্গেট করছে রাশিয়া। এমন গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে সংস্থাটির এক হুইসেলব্লোয়ারের ফাঁস করা হাজার হাজার নথিতে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস এবং ফ্রান্সের অনুসন্ধানী গণমাধ্যম ডিসক্লোজের হাতে আসা এসব নথিতে দেখা যায়, রাশিয়া ইন্টারপোলের রেড নোটিস ও রেড ডিফিউশন ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করে ভিন্নমতাবলম্বীদের গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানিয়ে আসছে।

ডেটা বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, গত এক দশকে ইন্টারপোলের স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি সংস্থা—কমিশন ফর দ্য কন্ট্রোল অব ইন্টারপোল’স ফাইলস (সিসিএফ) সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পেয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। অভিযোগের সংখ্যা দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দেশ তুরস্কের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।

এ ছাড়া রাশিয়ার পাঠানো গ্রেপ্তার অনুরোধের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মামলা বাতিল হয়েছে বলেও দেখা যায়। ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি আরোপ করে ইন্টারপোল। সংস্থাটি তখন জানায়, ইউক্রেন যুদ্ধের ভেতরে বা বাইরে ব্যক্তিদের টার্গেট করতে ইন্টারপোলের চ্যানেল অপব্যবহার ঠেকানোই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।

তবে ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, এসব বাড়তি যাচাই ব্যবস্থাও রাশিয়ার অপব্যবহার ঠেকাতে পারেনি। হুইসেলব্লোয়ার বিবিসিকে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে এসব কঠোর ব্যবস্থার কিছু অংশ নীরবে প্রত্যাহার করা হয়। এ বিষয়ে ইন্টারপোল জানায়, তাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতি বছর বিশ্বের হাজার হাজার ভয়ংকর অপরাধী গ্রেপ্তার হয়। সংস্থাটি দাবি করে, অপব্যবহার ঠেকাতে তাদের একাধিক ব্যবস্থা রয়েছে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। ইন্টারপোল আরও জানায়, গ্রেপ্তারের অনুরোধ ব্যক্তির জীবনে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে তারা সচেতন।

ফাঁস হওয়া নথিতে নাম থাকা রুশ ব্যবসায়ী ইগর পেস্ত্রিকভ বলেন, ‘যখন আপনার বিরুদ্ধে একটি রেড নোটিস জারি হয়, তখন আপনার জীবন পুরোপুরি বদলে যায়।’ ইন্টারপোল নিজে কোনো বৈশ্বিক পুলিশ বাহিনী নয়। এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতা ও তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

রেড নোটিস হলো ইন্টারপোলের ১৯৬টি সদস্য দেশের কাছে পাঠানো একটি সতর্কবার্তা, যাতে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানানো হয়। রেড ডিফিউশন একই ধরনের অনুরোধ হলেও তা নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে পাঠানো হয়। পেস্ত্রিকভ জানান, ২০২২ সালের জুনে তিনি রাশিয়া ছাড়ার পর জানতে পারেন, তার বিরুদ্ধে একটি রেড ডিফিউশন জারি করা হয়েছে। তিনি ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর চার মাস পর ফ্রান্সে আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন।

তিনি বলেন, তখন তাঁর সামনে দুটি পথ ছিল—একটি পুলিশের কাছে গিয়ে জানানো যে তিনি ইন্টারপোলের তালিকায় আছেন এবং গ্রেপ্তারের ঝুঁকি নেওয়া, অথবা আত্মগোপনে থাকা। তাঁর ভাষায়, আত্মগোপনে থাকার অর্থ হলো বাসা ভাড়া নিতে না পারা এবং ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়ে যাওয়া। তাঁর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল।

পেস্ত্রিকভ জানান, নিরাপত্তার কারণে তাঁর মেয়ে ও স্ত্রী অন্য দেশে চলে যেতে বাধ্য হন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ যেকোনো সময় বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারে—এই ভয়ে মানুষ নিজেকে কোণঠাসা ইঁদুরের মতো মনে করে।’ পেস্ত্রিকভ নব্বইয়ের দশকে বেসরকারিকরণ হওয়া রাশিয়ার বড় ধাতু কোম্পানিগুলোর একজন প্রধান শেয়ারহোল্ডার ছিলেন। এর মধ্যে সোলিকামস্ক ম্যাগনেশিয়াম প্ল্যান্ট অন্যতম।

তিনি বলেন, ইউক্রেন আগ্রাসনের আগে কয়েক মাস ধরে রাশিয়ার সরকারি মন্ত্রীরা তাঁকে বিদেশে পণ্য বিক্রি বন্ধ করে শুধু দেশীয় বাজারে সরবরাহ করতে চাপ দিচ্ছিলেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এতে তার পণ্য যুদ্ধবিমান ও ট্যাংকের মতো সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে। তিনি বলেন, এটি শুধু কম দামে পণ্য বিক্রির বিষয় নয়, বরং একটি নৈতিক প্রশ্ন। তাঁর ভাষায়, ‘কেউই পরোক্ষভাবেও মানুষ হত্যায় ব্যবহৃত কোনো কিছুর উৎপাদনের সঙ্গে জড়াতে চায় না।’

পেস্ত্রিকভ মনে করেন, এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানানো এবং তাঁর তৎকালীন স্ত্রী ইউক্রেনীয় হওয়ায় তাঁর কোম্পানিগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয় এবং তার বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধের তদন্ত শুরু করা হয়। ফ্রান্সে পালিয়ে যাওয়ার পর পেস্ত্রিকভ ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানতে পারেন, তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া রেড ডিফিউশন অনুরোধটি প্রাথমিক যাচাই পাস করেছে।

এরপর তিনি ইন্টারপোলের স্বাধীন নজরদারি সংস্থা সিসিএফ-এর কাছে অভিযোগ করেন এবং দাবি করেন, রাশিয়ার অনুরোধটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইন্টারপোলের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, সংস্থাটি রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় বা জাতিগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না।

প্রায় দুই বছর তালিকায় থাকার পর সিসিএফ রায় দেয়, পেস্ত্রিকভের মামলাটি মূলত রাজনৈতিক। সিসিএফ জানায়, রাশিয়ার দেওয়া তথ্য ছিল ‘সাধারণ ও ছকবাঁধা’ এবং অভিযোগের পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ছিল না। এরপর ইন্টারপোল তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার অনুরোধ বাতিল করে।

ইন্টারপোল ২০১৮ সালের পর থেকে কোন দেশগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, সে তথ্য প্রকাশ করে না। ফলে সমস্যার প্রকৃত মাত্রা নির্ধারণ কঠিন। তবে ফাঁস হওয়া নথিতে প্রথমবারের মতো বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। নথিতে দেখা যায়, গত ১১ বছর ধরে রাশিয়ার বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে। গত এক দশকে অন্তত ৭০০ জন ব্যক্তি, যাদের বিরুদ্ধে রাশিয়া গ্রেপ্তার অনুরোধ জানিয়েছিল, তারা সিসিএফ-এ অভিযোগ করেন। এর মধ্যে অন্তত ৪০০ জনের ক্ষেত্রে রেড নোটিস বা রেড ডিফিউশন বাতিল করা হয়—যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।

ব্রিটিশ ব্যারিস্টার বেন কিথ বলেন, ‘ঐতিহাসিকভাবে রাশিয়া রেড নোটিস অপব্যবহারের অন্যতম প্রধান দেশ।’ তিনি বলেন, ইন্টারপোলের রাশিয়া সংক্রান্ত সমস্যা গুরুতর এবং অপব্যবহার ঠেকানোর উদ্যোগ সফল হয়নি। আন্তর্জাতিক আইনজীবী ইউরি নেমেটস বলেন, যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার কারণে অনেককে সাধারণ আর্থিক অপরাধে অভিযুক্ত করে ইন্টারপোল ডেটাবেসে ঢোকানো হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই সিস্টেম অপব্যবহার করা খুব কঠিন কিছু নয়।’

হুইসেলব্লোয়ার ইন্টারপোলের ম্যাসেজিং সিস্টেমে পাঠানো হাজার হাজার বার্তাও বিবিসিকে দিয়েছেন। এতে দেখা যায়, রেড নোটিস বাতিল হলেও রাশিয়া অনানুষ্ঠানিকভাবে বিদেশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ব্যক্তিদের অবস্থান জানতে চেয়েছে।

এর মধ্যে সাংবাদিক আরমেন আরামিয়ান সম্পর্কিত একটি বার্তাও রয়েছে। তিনি আলেক্সেই নাভালনির পক্ষে প্রতিবেদন করায় রাশিয়া ছাড়তে বাধ্য হন। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, রাশিয়ার ওপর বিধিনিষেধ থাকা অবস্থায় তার অবস্থান জানতে বার্তা পাঠানো হয়। আরামিয়ান বলেন, তিনি বিস্মিত হলেও অবাক নন। তাঁর মতে, সামান্য তথ্য পেলেও তা রাশিয়ার জন্য মূল্যবান। নথিতে নাভালনির সহযোগী লিউবভ সোবল ও ভিন্নমতাবলম্বী গ্লেব কারাকুলভ সম্পর্কিত তথ্য আদান-প্রদানের কথাও রয়েছে।

২০২৪ ও ২০২৫ সালের ইন্টারপোলের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে রাশিয়ার কর্মকাণ্ড নিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। এক প্রতিবেদনে রাশিয়ার ‘ইচ্ছাকৃত অপব্যবহার’ এবং ‘স্পষ্ট নিয়ম লঙ্ঘনের’ কথা উল্লেখ করা হয়। তবুও ২০২৪ সালে রাশিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ অনুরোধ প্রাথমিক যাচাই পাস করে। একই সময়ে সিসিএফ প্রায় অর্ধেক অভিযোগে রাশিয়ার অনুরোধ বাতিল করে।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার পর রাশিয়া আদালতের বিচারক ও কৌঁসুলিদের বিরুদ্ধে রেড ডিফিউশন দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা প্রত্যাখ্যান করা হয়। হুইসেলব্লোয়ার জানান, ২০২৫ সালে ইন্টারপোল নীরবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নেওয়া কিছু অতিরিক্ত ব্যবস্থা তুলে নেয়। ইন্টারপোল জানায়, ডেটা প্রক্রিয়াকরণের কঠোর নিয়মের কারণে তারা এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে পারছে না।

বিবিসি রাশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য জানতে চাইলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। আইনজীবীরা বলছেন, ধারাবাহিক ও গুরুতর অপব্যবহারের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশকে সাময়িকভাবে ইন্টারপোল ব্যবস্থা থেকে স্থগিত করা উচিত।

অন্যথায় ইগর পেস্ত্রিকভের আশঙ্কাই সত্যি হবে। তাঁর ভাষায়, ‘একটি বোতাম চাপলেই রাশিয়া যেকোনো অপরাধ চাপিয়ে দিয়ে সারা বিশ্বে কাউকে হয়রানি করতে পারে।’

ইউক্রেনকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা গ্যারান্টির নথি ‘শতভাগ প্রস্তুত’, স্বাক্ষরের অপেক্ষা

সন্দেহভাজন রুশ ট্যাংকারের ভারতীয় ক্যাপ্টেনকে আটক করল ফ্রান্স

আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ক বিক্রির জন্য নয়—সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধের ঘোষণা মাখোঁর

বিদায়, স্যার মার্ক টালি—যাঁর কণ্ঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে জেনেছিল বিশ্ব

সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ মার্কিন মধ্যস্থতার প্রথম রাশিয়া–ইউক্রেন সরাসরি আলোচনা

আফগানিস্তানে সম্মুখযুদ্ধে ছিল না ন্যাটো সেনারা—ট্রাম্পের বক্তব্যের তীব্র নিন্দা স্টারমারের

যুক্তরাজ্যের হুমকিই সার, ইংলিশ চ্যানেলে কয়েক ডজন নিষিদ্ধ রুশ তেলের জাহাজ

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের মূল ইস্যু ‘ভূখণ্ড’, ‘বিভক্ত-দুর্বল’ ইউরোপকে দুষলেন জেলেনস্কি

প্রথমবার বৈঠকে বসতে যাচ্ছে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন

রুশ তেলবাহী জাহাজ আটক করল ফ্রান্স, নাবিকেরা সবাই ভারতীয়