পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতকে কেন্দ্র করে দেশটির জোট সরকার এবং বিচারপতিদের মধ্যে চলমান সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করেছে। উত্তপ্ত পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানী ওয়ারশতে অবস্থিত সাংবিধানিক আদালতের সামনে সাঁজোয়াযান ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্কের মধ্যপন্থী সরকার এবং সাবেক ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল ‘ল অ্যান্ড জাস্টিস’ (পিআইএস) পার্টির অনুসারী বিচারকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চলা ক্ষমতার লড়াই থেকেই এই নজিরবিহীন সংকটের উৎপত্তি।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতি ঘটে যখন পোল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী ভালদেমার জুরেক সাংবিধানিক আদালতের সভাপতি বগদান শোয়েচকভস্কি এবং সহ-সভাপতি বার্তোলোমেই সোখানস্কির বিচার বিভাগীয় অনাক্রম্যতা (ইমিউনিটি) তুলে নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানান। তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনার পরিকল্পনা করছে বিচার বিভাগ।
গতকাল শুক্রবার ওয়ারশতে আদালতের বাইরে পিআইএস সমর্থকেরা তুমুল বিক্ষোভ শুরু করলে দাঙ্গা পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এগিয়ে আসে। বিক্ষোভকারীদের ভবনে প্রবেশে বাধা দিতে আদালত চত্বর ঘিরে ফেলে পুলিশ।
আন্তর্জাতিক সফর চলাকালীন এই সংকটের খবর পেয়ে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট ক্যারল নাভরোকি সেনেগালগামী বিমান মাঝপথ থেকেই ঘুরিয়ে দেশে ফিরে আসেন। যুব অলিম্পিক গেমসে যোগ দিতে ডাকার যাওয়ার কথা ছিল তার। দেশে ফিরেই পিআইএস সমর্থিত এই প্রেসিডেন্ট সরাসরি সাংবিধানিক আদালতে প্রবেশ করেন বলে তাঁর চিফ অব স্টাফ নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাংবিধানিক আদালত দাবি করেছে, অভিযুক্ত দুই বিচারক এখনো তাঁদের নিজ পদে বহাল রয়েছেন এবং তাঁদের সরানোর এই উদ্যোগ অসাংবিধানিক। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই ধরনের পদক্ষেপের সাথে যুক্ত সকল ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের মতো অপরাধ করছেন।’
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্ক তাঁর সরকারের পদক্ষেপকে শক্তভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ লেখেন, ‘আইনের শাসন পুনরুদ্ধার করা আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। ল অ্যান্ড জাস্টিস দলের বছরের পর বছর ধরে চালানো বেআইনি কর্মকাণ্ডের পর এটি একটি কঠিন এবং বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া, তবে এর জন্য কঠোর পদক্ষেপের বিকল্প নেই।’
সাংবিধানিক আদালতের সভাপতিকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়ার পর পোল্যান্ডের পার্লামেন্ট কর্তৃক মনোনীত বিচারক আনা কোরভিন-পিওত্রভস্কা আদালতের সাময়িক দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট নাভরোকি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ তুলে আসছেন, এই বিচারকদের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় আইনি ত্রুটি ছিল। এ কারণে তিনি নতুন বিচারকদের শপথ পাঠ করাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলেন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউরোপীয় কাউন্সিলের ভেনিস কমিশন এক রুলিংয়ে জানায়, বিচার বিভাগীয় অচলাবস্থা নিরসনে প্রেসিডেন্ট নাভরোকির উচিত এসব বিচারকের দ্রুত শপথ গ্রহণ করানো। বিচারমন্ত্রী জুরেকের অভিযোগ, শোয়েচকভস্কি ও তাঁর ডেপুটি নতুন বিচারকদের কাজ করতে না দিয়ে অপরাধমূলক আচরণ করেছেন।
পোল্যান্ডের সর্বোচ্চ আদালতের এই রাজনীতিকীকরণ কেন্দ্রিক বিতর্কের সূচনা ২০১৫ সালে, যখন পিআইএস দল ক্ষমতায় এসে আদালতের অধিকাংশ পদে নিজেদের অনুগত বিচারকদের নিয়োগ দেয়। পোল্যান্ডে যেকোনো আইনের সাংবিধানিক বৈধতা পর্যালোচনার ক্ষমতা কেবল এই আদালতের হাতেই রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জাস্টিস কোর্ট রুলিং জারি করে যে, পিআইএস সরকার অনিয়মের মাধ্যমে নিজস্ব বিচারকদের বসিয়ে সাংবিধানিক আদালতের নিরপেক্ষতা নষ্ট করেছে। এই ইউরোপীয় রায়ের ওপর ভিত্তি করেই ডোনাল্ড টুস্কের বর্তমান সরকার সাংবিধানিক আদালতের রায় প্রকাশ করা বন্ধ করে দেয়।
তবে আগামী বছর পোল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। টুস্কের রাজনৈতিক বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা বাড়াতে টুস্ক আদালত সংস্কারের নামে এই বিতর্কিত উদ্যোগ নিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি তাঁর ক্যাবিনেটের সাবেক মন্ত্রী ও আইনজীবী মাচেই বেরেককে আদালতের বিচারক হিসেবে মনোনীত করায় সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আইনজীবী ও আইনি বিশ্লেষক অধ্যাপক মার্সিন মাতচাক সরকারের কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করে সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘অস্ত্রধারী পুলিশের উপস্থিতি এবং বিচারমন্ত্রীর জারি করা নির্দেশের মাধ্যমে সাংবিধানিক আদালতের প্রধানকে সরানোর এই ঘটনা পোল্যান্ডে আইনের শাসনের ওপর আগামী বহু বছরের জন্য একটি নেতিবাচক ও বিপজ্জনক প্রভাব ফেলবে।’
সংকট সমাধানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় পোল্যান্ডের বিচার বিভাগীয় ও সাংবিধানিক অচলাবস্থা আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।