ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গতকাল বুধবার জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা থেকে তাঁর দেশ আর মাত্র ‘১০ শতাংশ’ দূরে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত এবং মস্কোকে পুরস্কৃত করার বিরুদ্ধেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের এই ভয়াবহতম সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রচেষ্টা গত কয়েক সপ্তাহে বেশ গতি পেয়েছে। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী মীমাংসায় ভূখণ্ডের মালিকানা নিয়ে দুই পক্ষ এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা বর্তমানে রাশিয়ার দখলে। চুক্তির অংশ হিসেবে রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্ব দনবাস অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে মরিয়া। কিন্তু কিয়েভ সতর্ক করে বলেছে, ভূখণ্ড ছেড়ে দিলে তা মস্কোকে আরও উৎসাহিত করবে।
খ্রিষ্টীয় নববর্ষের ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, তাঁর দেশ যুদ্ধ শেষ করতে চায় ঠিকই, তবে তা ‘যেকোনো মূল্যে’ নয়। যেকোনো চুক্তির জন্য শক্তিশালী নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন, যাতে রাশিয়া পুনরায় আক্রমণ করার সাহস না পায়। টেলিগ্রামে পোস্ট করা সেই ভাষণে জেলেনস্কি বলেন, ‘শান্তিচুক্তি ৯০ শতাংশ প্রস্তুত। বাকি আছে কেবল ১০ শতাংশ। আর এই ১০ শতাংশ মানে কেবল সংখ্যা নয়।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘এই ১০ শতাংশই ঠিক করে দেবে শান্তির ভাগ্য, ইউক্রেন ও ইউরোপের ভবিষ্যৎ।’
শীর্ষ দূত স্টিভ উইটকফসহ মার্কিন কর্মকর্তারা ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে এই চার বছরের যুদ্ধ অবসানের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার কয়েক ঘণ্টা পরই জেলেনস্কি এই ভাষণ দেন। পঞ্চম বছরে পা রাখা এই যুদ্ধ ধ্বংসযজ্ঞের এক বিশাল ঢেউ বয়ে এনেছে, যা লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং ইউক্রেনের পুরো শহরগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর নববর্ষের ভাষণে রুশদের ইউক্রেন যুদ্ধে বিজয়ের ওপর বিশ্বাস রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর এটি তাঁর চতুর্থ নববর্ষের ভাষণ। রুশ নেতা ক্রমাগত তাঁর দেশের নাগরিকদের বলে আসছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে রুশ সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের বাকি জমি, যা তিনি নিজের বলে দাবি করেছেন, শক্তি প্রয়োগ করেই দখল করবে। সেনাদের ‘বীর’ সম্বোধন করে পুতিন ভাষণে বলেন, ‘আমরা আপনাদের ওপর এবং আমাদের বিজয়ে বিশ্বাস রাখি।’
ক্রেমলিন এ সপ্তাহে জানিয়েছে, তারা যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার শর্ত আরও ‘কঠোর’ করবে। তারা অভিযোগ করেছে, মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের মধ্যবর্তী নভগোরোদ অঞ্চলে পুতিনের লেকের ধারের বাসভবন লক্ষ্য করে ইউক্রেন কয়েক ডজন ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
রাশিয়া একে পুতিনের ওপর একটি ‘ব্যক্তিগত’ ও ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং বলেছে। এর ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তাদের আলোচনার অবস্থান আরও কঠোর হবে। রাতের অন্ধকারে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বনাঞ্চলে বরফের ওপর একটি ক্ষতিগ্রস্ত ড্রোন পড়ে আছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলাটি ছিল ‘লক্ষ্যবস্তু নির্দিষ্ট, সতর্কভাবে পরিকল্পিত এবং পর্যায়ক্রমে পরিচালিত’।
তবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) মঙ্গলবার জানিয়েছে, নভগোরোদ ওব্লাস্তে পুতিনের বাসভবনে ইউক্রেনীয় হামলার দাবির পক্ষে তারা সাধারণ কোনো ফুটেজ বা রিপোর্ট দেখেনি। পুতিন নিজে এই হামলা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। ক্রেমলিন জানিয়েছে, তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ফোনে এ বিষয়ে অবহিত করেছেন। হামলার সময় রুশ নেতা কোথায় ছিলেন, সে সম্পর্কেও মস্কো কিছু জানায়নি। উল্লেখ্য, পুতিনের ব্যক্তিগত জীবন ও বাসভবন সব সময় গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা থাকে।