জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ প্রথমবারের মতো চীন সফর শুরু করেছেন। এই সফরের মূল লক্ষ্য বাণিজ্য সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা গভীর করা। আজ বুধবার তিনি বেইজিং পৌঁছান। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
বেইজিংয়ে মার্জ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মার্জ বলেন, জার্মানি চীনের সঙ্গে বহু দশকের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তির ওপর এগোতে চায়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সহযোগিতা যেন ন্যায্য হয় এবং যোগাযোগ খোলা ও স্বচ্ছ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। মার্জ আরও বলেন, ‘আমাদের সহযোগিতা নিয়ে কিছু নির্দিষ্ট উদ্বেগ আছে। আমরা সেগুলো উন্নত করতে চাই এবং আরও ন্যায্য করতে চাই।’ চীনা প্রতিযোগিতার কারণে জার্মানির উৎপাদন খাত যে চাপের মুখে পড়েছে, সেই বাস্তবতাকেই তিনি ইঙ্গিত করেন।
বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠকে বসেন দুই নেতা। সেখানে লি কিয়াং বলেন, উভয় পক্ষের উচিত বহুপাক্ষিকতা ও মুক্তবাণিজ্য রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করা। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির দিকে ইঙ্গিত করেন। এই নীতি বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
লি বলেন, ‘চীন ও জার্মানি বিশ্বের দুটি বৃহৎ অর্থনীতি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী দেশ। আমাদের সহযোগিতায় আস্থা জোরদার করতে হবে। যৌথভাবে বহুপক্ষীয় ও মুক্তবাণিজ্য রক্ষা করতে হবে। এবং আরও ন্যায্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চেষ্টা করতে হবে।’ বৈঠকের সময় দুই দেশের প্রতিনিধিরা জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যনিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করেন।
মার্জ বলেন, ‘বিশ্বের প্রতি আমাদের যৌথ দায়িত্ব আছে। আমাদের একসঙ্গে সেই দায়িত্ব পালন করা উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আরও প্রবৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা রয়েছে।’ তিনি জানান, খোলা যোগাযোগ চ্যানেল অত্যন্ত জরুরি। আগামী মাসগুলোতে তাঁর সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী চীন সফর করবেন বলেও ঘোষণা দেন।
গত বছর চীন থেকে জার্মানির আমদানি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১৭০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যা প্রায় ২০১ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে চীনে জার্মানির রপ্তানি ৯ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ৮১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে, যা প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলার।
এই সফরের অংশ হিসেবে মার্জ চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেবেন। তিনি চীনে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলা জার্মান কোম্পানিগুলোতেও যাবেন। এর মধ্যে রয়েছে সিমেন্স ও মার্সিডিজ বেঞ্জ। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূরাজনীতি ও মানবাধিকার ইস্যুও আলোচনায় থাকবে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়াকে চীনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে জার্মানির উদ্বেগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একের পর এক পশ্চিমা নেতা বেইজিং সফর করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্কের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রভাবের মধ্যেই এসব সফর হচ্ছে।
গত শুক্রবার মার্জ বলেন, রপ্তানিনির্ভর জার্মানির বিশ্বের সব অঞ্চলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রয়োজন। সে কারণেই তিনি বেইজিং যাচ্ছেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের কোনো বিভ্রমে থাকা উচিত নয়।’ তিনি যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন এখন নিজস্ব নিয়মে নতুন বহুপক্ষীয় বৈশ্বিক ব্যবস্থা নির্ধারণের অধিকার দাবি করছে।