হোম > বিশ্ব > চীন

চীনে এখন শিশুর চেয়ে প্রবীণ বেশি, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

দেশটিতে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা এখন ২২ কোটি ৩০ লাখের বেশি। ছবি: পেক্সেলস

চীনে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল প্রবীণ মানুষের অনুপাত এবার শিশুদের ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির জনসংখ্যার কাঠামোয় এই পরিবর্তন অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া, পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি এবং পারিবারিক আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিকে দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত সপ্তাহে প্রকাশিত চীনের সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে কর্মক্ষম জনসংখ্যার তুলনায় নির্ভরশীল প্রবীণদের অনুপাত বেড়ে ২৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, শিশুদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত ছিল ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভরশীল প্রবীণ মানুষের অনুপাত এই প্রথম শিশুদের ছাড়িয়ে গেল। অর্থনীতিতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রভাব কতটা পড়তে পারে, তা বোঝার জন্য এই পরিসংখ্যান বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২২ কোটি ৩০ লাখের বেশি। তাঁরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ১৪ বছর বা তার কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ২১ কোটি ৩০ লাখ। অর্থাৎ, মোট সংখ্যার হিসাবেও প্রবীণ মানুষের সংখ্যা শিশুদের ছাড়িয়ে গেছে। জনসংখ্যার এই পরিবর্তন শুধু বয়সভিত্তিক ভারসাম্যকেই বদলে দিচ্ছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যার বার্ধক্য চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এর প্রভাব পড়তে পারে পরিবারগুলোর ব্যয়, পেনশনব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি বিনিয়োগের ওপর। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে উৎপাদন ও শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে প্রবীণ মানুষের পরিচর্যা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। ফলে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।

হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক স্টুয়ার্ট গিয়েটেল-বাস্টেন বলেন, জনসংখ্যার এই পরিবর্তনের প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। এর অর্থ হতে পারে, সরকারি ব্যয়ের একটি বড় অংশ পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয়ের বদলে পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে চলে যাবে। অন্যদিকে, সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের প্রভাষক মু ঝেং মনে করেন, জনসংখ্যার এই প্রবণতা চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সীমিত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

জনসংখ্যার এই সংকট মোকাবিলায় চীন কয়েক বছর ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার তরুণ প্রজন্মকে বিয়ে করতে ও দম্পতিদের আরও বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করছে। তবে জন্মহার ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় সেই উদ্যোগে খুব বেশি সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি নিলেও এখন চীনকে উল্টো বেশি সন্তান জন্মদানে উৎসাহ দিতে হচ্ছে।

দেশটির জনসংখ্যা কমে যাওয়া ও বার্ধক্য বাড়ার পেছনে দ্রুত নগরায়ণ এবং বিতর্কিত এক সন্তান নীতির প্রভাব রয়েছে। ১৯৮০ থেকে ২০১৫ সালের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকা ওই নীতির উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা। চীনের সরকারের অনুমান, এই নীতির ফলে প্রায় ৪০ কোটি শিশুর জন্ম ঠেকানো সম্ভব হয়েছিল। তবে এ হিসাবের যথার্থতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

মু ঝেংয়ের মতে, জনসংখ্যা সংকুচিত হওয়ার পেছনে এক সন্তান নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে পরিবারে প্রবীণ আত্মীয়দের ভরণপোষণের দায়িত্ব নেওয়ার মতো তরুণ মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। একই সঙ্গে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার পরিবর্তন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার হার বাড়ার মতো বিষয়ও প্রভাব ফেলছে। অর্থাৎ, শুধু সরকারি নীতি শিথিল করলেই জন্মহার বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবনযাপন, আর্থিক সামর্থ্য ও সামাজিক বাস্তবতা।

জনসংখ্যার বার্ধক্য মোকাবিলায় সরকারি সহায়তাও বাড়াচ্ছে বেইজিং। চলতি বছরের শুরুর দিকে ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রবীণদের জন্য বাড়তি সহায়তার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৫ কোটি ৩০ লাখের বেশি প্রবীণ নাগরিক বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও আর্থিক সহায়তা পাচ্ছিলেন। প্রবীণদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এই খাতে সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে।

তবে জনসংখ্যার বার্ধক্যকে শুধু অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, দেশটির ‘মাঝারি মাত্রায় বার্ধক্যগ্রস্ত সমাজে’ প্রবেশ করার পেছনে অতীতে জন্ম নেওয়া বিভিন্ন বয়সী জনগোষ্ঠীর আকার ও মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার মতো কারণ রয়েছে। পত্রিকাটির মতে, এর ফলে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তবে প্রবীণ ভোক্তাদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘সিলভার ইকোনমি’ বা প্রবীণদের অর্থনীতিতে নতুন সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

গ্লোবাল টাইমস এক গবেষকের বরাতে লিখেছে, এটি জনসংখ্যার বিকাশের ঐতিহাসিক ধারার প্রতিফলন, স্বল্পমেয়াদি কোনো ঘটনা নয়। পত্রিকাটি আরও উল্লেখ করেছে, ১৯৫০ থেকে ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে জন্ম নেওয়া অনেক মানুষ এখন বার্ধক্যে প্রবেশ করছেন। আগের প্রজন্মের তুলনায় তাঁদের অনেকের আয় বেশি, ক্রয়ক্ষমতা শক্তিশালী ও তাঁরা তুলনামূলকভাবে সুস্থ। ফলে প্রবীণ মানুষের চাহিদাকে ঘিরে স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা, অবসরযাপন ও অন্যান্য পণ্য-সেবার নতুন বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে জনসংখ্যার বার্ধক্য পরিমাপে ব্যবহৃত নির্ভরশীলতার অনুপাত নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। এই সূচকে কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় শিশু ও প্রবীণদের সংখ্যা বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বয়সের ভিত্তিতে কাউকে নির্ভরশীল হিসেবে গণ্য করলে তাঁর বাস্তব কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের সামর্থ্য পুরোপুরি বোঝা যায় না।

অধ্যাপক গিয়েটেল-বাস্টেনের মতে, এই পরিসংখ্যানের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে প্রবীণদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতাকে খাটো করে দেখার ঝুঁকি থাকে। অনেক প্রবীণকে ভুলভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ফলে মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সময় বাড়ার বিষয়টিও এই সূচকে প্রতিফলিত হয় না।

মাওকে নিয়ে কৌতুকের জেরে চীনে এমবাপ্পেকে বয়কট, স্পনসরশিপ বাতিল

তিব্বতে ভূমিকম্প: উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে বেইজিং

তিব্বতের ভূমিকম্পে নিহত অন্তত ১৮

চীনের তিব্বতে ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

জিডিপি, শ্রমবাজার ও আবাসনে স্বস্তিতে চীন

ইন্দোনেশিয়ার খরাসংকট নিরসনে চীনের নলকূপ প্রকল্প

জিনজিয়াংয়ে ক্যাফে খোলায় স্টারবাকসকে উইঘুর নিয়ে খোঁচা, চীনের জবাব

আগামী বছর তাইওয়ান আক্রমণ করবে না চীন—মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র

চীনের ৭৭তম বার্ষিকীর প্রাক্কালে নবজাগরণের আহ্বান সির

সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে, শিক্ষায় আমূল সংস্কারের পথে চীন