মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অস্থিতিশীলতা, সীমান্তে অপরাধ বৃদ্ধি ও নিরাপত্তাঝুঁকির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রায় ১০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ নিরাপত্তা বেড়া নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে স্থলসীমান্তে বাংলাদেশ স্থায়ী সীমান্তবেড়া নির্মাণ করবে।
সরকারি সূত্রের বরাতে নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে বেড়া নির্মাণ করা হবে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ঠিক কোন কোন এলাকায় এই অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
গত মাসে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সীমান্তে মাদক, অস্ত্র ও মানব পাচার রোধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা দমনও এর অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি) বলছে, রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় মিয়ানমার সরকারের প্রচলিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যত ভেঙে পড়েছে। ফলে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. শহিদুল হক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু ব্যক্তি অর্থের বিনিময়ে আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে সীমান্ত অতিক্রম করছেন বলে নিরাপত্তা সংস্থার উদ্বেগ রয়েছে। একই সঙ্গে ওই পথ ব্যবহার করে দেশে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র প্রবেশের ঘটনাও বেড়েছে। তাঁর মতে, সীমান্তে বেড়া নির্মাণের পাশাপাশি সড়কে টহল থাকলে নজরদারি আরও কার্যকর হবে।
মেজর (অব.) জেনারেল মো. শহিদুল হক আরও বলেন, মিয়ানমার ২০০৯-১০ সালের দিকে নাফ নদীর তীরবর্তী সীমান্তে প্রায় ১২০ কিলোমিটার বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করলেও মাত্র ৭০ কিলোমিটার নির্মাণের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর পরামর্শ, বাংলাদেশের উচিত প্রথমে নাফ নদীসংলগ্ন অংশ ও পরে নাইক্ষ্যংছড়ি-বান্দরবানের দুর্গম পার্বত্য সীমান্ত এলাকায় বেড়া নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শেষ দিকে আরাকান আর্মি মংডু দখলের পর সীমান্ত পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন ঘটে। এর পর থেকে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে অন্তত ৪২৬ জন বাংলাদেশি জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩২৪ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও অবশিষ্ট জেলেরা এখনো আটকে আছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আরাকান আর্মির অর্থসংস্থানের একটি উৎস হিসেবে জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মাদক, অস্ত্র ও মানব পাচারের ঝুঁকিও বেড়েছে। এই অবস্থায় সীমান্তে স্থায়ী নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তোলা সীমান্তবর্তী জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।