চোখ শুধু দেখার অঙ্গ নয়, এটি পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা আর সম্পর্ক গড়ে তোলার শক্তিশালী মাধ্যম। অথচ দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে আমরা চোখের যত্ন নেওয়ার কথাই সবচেয়ে কম ভাবি। যতক্ষণ না চোখের নজর ঝাপসা হয়ে আসে কিংবা কাছের কিছু পড়তে হাত অজান্তেই দূরে সরে যায়, ততক্ষণ চোখের গুরুত্ব যেন আমাদের ‘চোখেই পড়ে না’।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের সেন্টার ফর আই রিসার্চের ডেপুটি ডিরেক্টর অধ্যাপক লরেন আইটনের মতে, অন্ধত্ব একটি ভয়ংকর প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় ৯০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি হ্রাস প্রতিরোধযোগ্য, নয়তো চিকিৎসাযোগ্য। অন্য অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার মতোই চোখ ভালো রাখতে প্রয়োজন সঠিক খাদ্যাভ্যাস, সক্রিয় জীবনধারা এবং নিয়মিত পরীক্ষা।
শৈশব ও কৈশোর: বাড়তে থাকা নিকট দৃষ্টি বর্তমানে সারা বিশ্বে শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া বা নিকট দৃষ্টি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রতি তিনজন শিশুর একজন এখন এই সমস্যায় ভুগছে। এর সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা যায় না।
মধ্যবয়স: ‘হাত ছোট হয়ে গেছে’ অনুভূতি চল্লিশের মাঝামাঝি বয়সে অনেকে হঠাৎ টের পান, কাছের লেখা পড়তে হলে হাত বাড়াতে হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় প্রেসবায়োপিয়া। এটি বয়সজনিত এবং পুরোপুরি অনিবার্য।
প্রেসবায়োপিয়া: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের লেন্স শক্ত হয়ে যায়, ফলে কাছের জিনিসে ফোকাস করা কঠিন হয়ে পড়ে। এটি প্রতিরোধ করা যায় না। চশমাই এর একমাত্র সমাধান। আর চশমা পরলে চোখ আরও দুর্বল হয়ে যায়—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
ছানি: সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চোখের লেন্স ঘোলা হয়ে যেতে পারে। এটি প্রতিরোধযোগ্য না হলেও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুরোপুরি চিকিৎসা সম্ভব।
নীরবে দৃষ্টি কেড়ে নেওয়া রোগ: গ্লকোমা এবং বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশন—এই দুটি রোগের শুরুতে কোনো লক্ষণ দেখায় না। কিন্তু ধীরে ধীরে স্থায়ী দৃষ্টিহানি ঘটায়।
গ্লকোমা অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত করে আর ম্যাকুলার ডিজেনারেশন চোখের পেছনের রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশে প্রভাব ফেলে।
এই রোগগুলোর ক্ষেত্রে বড় অস্ত্র হলো আগাম শনাক্তকরণ। দেরিতে ধরা পড়লে যে দৃষ্টিশক্তি হারায়, তা আর ফেরানো যায় না।
অফ স্ক্রিন: অপ্রয়োজনীয় স্ক্রিন টাইম কমান
আউটডোর: নিয়মিত বাইরে সময় কাটান
অপটোমেটরিস্ট: নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করান
সূর্যের আলো চোখের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে সাহায্য করে। ধারণা করা হয়, সূর্যালোক চোখে ডোপামিন নিঃসরণে ভূমিকা রাখে, যা এর সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয়। তা ছাড়া বাইরে থাকলে চোখ দূরের জিনিসে ফোকাস করার সুযোগ পায়, যা ঘরের ভেতরে স্ক্রিনের সামনে বসে সম্ভব নয়। তাই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে প্রতিদিন ১ থেকে ২ ঘণ্টা বাইরে সময় কাটানো শিশুদের মায়োপিয়া কমাতে কার্যকর।
বয়স ৬০ বছরের কম হলে প্রতি ২ থেকে ৩ বছর পরপর চোখ পরীক্ষা যথেষ্ট। ৬০ পেরোলে চোখ পরীক্ষার ব্যবধান কমানো জরুরি।
অনেকে মনে করেন, স্ক্রিনের দিকে তাকালেই চোখ নষ্ট হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রিন নিজে থেকে চোখের সবচেয়ে বড় শত্রু—এমন প্রমাণ জোরালো নয়। মূল, স্ক্রিন আমাদের চোখের জন্য উপকারী অনেক কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, বিশেষ করে শিশুদের। তাই স্ক্রিন টাইম কমিয়ে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করুন।
অধ্যাপক ডা. সৈয়দ এ কে আজাদ, চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ও ফ্যাকো সার্জন, আল-রাজী হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা