ঢাকার তুরাগ নদী থেকে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের একাধিক নেতা-কর্মীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে—এমন একটি চাঞ্চল্যকর দাবি ভিডিওসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
আলোচিত দাবিতে ভাইরাল কয়েকটি পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।
‘Sheikh Ajam’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত ২৬ জুন আলোচিত দাবিতে একটি ভিডিও শেয়ার করা হয়, যা সম্ভাব্য সর্বাধিক ছড়িয়েছে। ভিডিওটি আজ (২৮ জুন) দুপুর ১টা ২৬ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫৮ হাজার বারের বেশি দেখা হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটিতে ১ হাজার ৪০০ রিয়েকশন, ১৬৬ কমেন্ট ও ১ হাজার ৪০০ বার শেয়ার করা হয়েছে।
শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্টে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কেউ কেউ ভিডিওটিকে সত্য মনে করে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কমেন্ট করেছেন, পুরোনো ভিডিও বলে।
আলোচিত ৪ সেকেন্ডের ভাইরাল ভিডিওটিতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তির নিথর দেহ সারিবদ্ধভাবে মাটিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে।
ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে ‘Abul Kalam Azad’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চলতি বছরের ২৫ মে শেয়ার করা একটি পোস্ট পাওয়া যায়। ওই পোস্টে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহতের কথা উল্লেখ করা হয় এবং এর ছবির সঙ্গে ছড়ানো ভিডিওর কিছুটা মিল পাওয়া যায়।
এই সূত্রের ওপর ভিত্তি করে অনুসন্ধানে দৈনিক আজকের পত্রিকা, বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার ও যমুনা টেলিভিশনে গত ২৫ মে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে একটি রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়েছেন এবং ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
আরও অনুসন্ধানে ‘Political Times’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ২৫ মে শেয়ার করা ৩৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ‘ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে (যমুনা সেতু পূর্ব পাড়) রড ভর্তি ট্রাক উল্টে এখনো পর্যন্ত নি* হত ১৮ জন আ* হত ২, উদ্ধার কার্যক্রম চলমান।’ ক্যাপশনে পোস্ট করা সেই ভিডিওটির একটি অংশের সঙ্গে সম্প্রতি ‘তুরাগ নদ থেকে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের লাশ উদ্ধার’ বলে প্রচারিত ভিডিওর মিল রয়েছে।
এদিকে, সম্প্রতি তুরাগ নদে কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান চালায় ফ্যাক্টচেক টিম। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২৪ ও ২৫ জুন তুরাগ নদের বিভিন্ন অংশ থেকে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতরা হলেন—মো. সুমন (১৭), আরিফ হাসান রাকিব এবং রনি মোল্লা।
প্রতিবেদনে পুলিশ ও নিহতদের পরিবার সূত্রের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়, গত ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে রানাভোলার বাসা থেকে বের হয়ে সাঁতার না জানা সুমন তুরাগ নদে পড়ে নিখোঁজ হন। ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া থানা-পুলিশ তাঁর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে। অন্যদিকে, ২৪ জুন সকালে আরিফ হাসান রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করে আমিনবাজার নৌ পুলিশ। নিহতের পরিবার জানিয়েছে, আরিফ ভালোমতো সাঁতার জানতেন। তবে কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে তা নিশ্চিত নয়।
অবশ্য প্রতিবেদনে উভয়ের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। একই দিন দুপুরে দিয়াবাড়ী ঘাটে গোসল করতে নেমে রনি মোল্লা (৩৫) নামের এক হোটেল কর্মচারী ডুবে মারা যান। স্থানীয়রা ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর তাঁকে মৃত অবস্থায় পাড়ে তোলেন। রনির মৃত্যু হওয়ার ঘটনায় সাভার মডেল থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।
লাশ উদ্ধারের এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পেজ ও আইডি (১ , ২ ,৩ ) থেকে দাবি করা হয়—তুরাগ থানা এলাকায় দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে হামলার পর ৭ জন নেতাকর্মী নিখোঁজ হন এবং ৩-৪ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।
তবে এসব তথ্য সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, ‘তুরাগ নদে ভাসছে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সাত নেতা-কর্মীর লাশ’ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। এ ধরনের মিথ্যা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য সবার প্রতি বাংলাদেশ পুলিশ অনুরোধ জানাচ্ছে।’
তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তুরাগ নদের আশুলিয়া থানা এলাকা থেকে ২২ জুনের পর একটি মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ওই দিন মিছিল হয়েছিল, বেশ কিছু আসামি গ্রেপ্তার হয়েছিল, সবই হয়েছে আশুলিয়া থানা এলাকায়।
তুরাগ নদ থেকে নিখোঁজ ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের লাশ উদ্ধার দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ভিন্ন ঘটনার। গত মে মাসে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ আরোহী নিহত হন, সেই দুর্ঘটনার ভিডিওকে তুরাগ নদে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের লাশ দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।