হোম > ফ্যাক্টচেক > দেশ

পাকিস্তান থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরের দৃশ্য দিয়ে যেভাবে ছড়ানো হলো চট্টগ্রামের বন্যা আতঙ্ক

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন পানির নিচে। এমন বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও এবং প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পড়েছে। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া এমন ৪টি দাবির সত্যতা যাচাই করেছে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম।

ভারতে খোয়াই নদীর গেট খুলে দেওয়ায় তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম

খোয়াই নদীর গেট খোলার দাবিতে ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

ভারতের খোয়াই নদীর ‘চাকমা গেট’ খুলে দেওয়ার কারণে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

আলোচিত দাবিতে শেয়ার করা একটি পোস্টে বলা হয়, ‘ইন্নালিল্লাহ খোয়াই‌ নদীর চাকমা গেট খুলে দিয়েছে ভা’রত। পুরো চট্টগ্রাম বিভাগ তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে...ঘন্টায় ঘন্টায় মানুষ জন মারা যাচ্ছে।’

আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো নেটিজেনদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

প্রচারিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে পাকিস্তানের গণমাধ্যম ‘হাম নিউজ’-এর অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ‘Flood situation in different areas after rains in Pakistan’ শিরোনামের ওই ভিডিওটির একটি অংশের সঙ্গে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওটি বাংলাদেশের বা ভারতের খোয়াই নদীর নয়; এটি পাকিস্তানে টানা মৌসুমি বৃষ্টির কারণে সিন্ধু নদে সৃষ্ট বন্যার দৃশ্য। এ ছাড়া ভৌগোলিক তথ্য অনুযায়ী, ‘খোয়াই’ নদীটি বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যার সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো সংযোগ নেই।

কম্পারিজন।

গর্ভবতী নারী ও শিশুকে বাঁচাতে কাঁধে সিএনজি অটোরিকশা

গর্ভবতী নারী উদ্ধারের দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

চট্টগ্রামের বন্যার প্রবল স্রোত থেকে এক গর্ভবতী নারী এবং তাঁর সন্তানকে বাঁচাতে কয়েকজন মানুষ একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা কাঁধে তুলে নদী পার করছেন—এমন একটি দাবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়, ‘সিএনজি কাঁধে তুলে নিয়ে গর্ভবতী মা ও শিশু’কে বাঁচালেন!! আলহামদুলিল্লাহ!!’

আলোচিত ভিডিওটির সত্যতা যাচাইয়ের অনুসন্ধানে জাতীয় গণমাধ্যম ‘জাগো নিউজ’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঘটনাটি মূলত বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের কাগজিখোলা-খুঁটাখালী ছড়া (খাল) এলাকার। বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম কোম্পানী বলেন, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড এবং লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সীমান্তে খুঁটাখালী খাল অবস্থিত। সেখানে একটি সেতুর অভাব দীর্ঘদিনের। তাই স্থানীয় লোকজন কাঁধে করে সিএনজিটি পারাপার করেছেন।

তিনি আরও বলেন, ৮ জুলাই ধারণ করা ভিডিওতে দেখানো সিএনজি অটোরিকশাটিতে কোনো গর্ভবতী নারী ও শিশু ছিল না। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে কাগজিখোলা-খুঁটাখালী ছড়ায় একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থায়ী সেতু নির্মাণ না হলে এলাকাবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে।

একই তথ্য পাওয়া যায়, ঢাকা মেইলে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেও।

কম্পারিজ।

কলাগাছের ভেলায় লাশ

ভেলায় লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার দাবিতে ছড়ানো ভিডিও। ছবি: স্ক্রিনশট

চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে মৃতদেহ দাফন করার জায়গা না পেয়ে কলাগাছের ভেলায় করে লাশ অজানা উদ্দেশে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওটিমুহূর্তেই নেটিজেনদের নজরে আসে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও আবেগের জন্ম দেয়।

দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ের অনুসন্ধানে‘BitiK BaaZ’ নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। শেয়ার করা ওই ভিডিওর একটি দৃশ্যের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওর মিল পাওযা যায়। ওই ভিডিওতে একজনকে বলতে দেখা যায়, লাশ ভেসে যাওয়ার ঘটনাটি ফেনীর একটি এলাকার। অর্থাৎ, ভিডিওটি সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের কোনো ঘটনার নয়। এটি মূলত ২০২৪ সালের বন্যার সময়ের ভিডিও।

এ ছাড়া সম্প্রতি চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ‘ভেলায় ভাসিয়ে লাশ নেওয়া হলো দূরের কবরস্থানে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও, সেই খবরের সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির কোনো মিল বা সম্পর্ক নেই।

কম্পেরিজন।

জীবন বাঁচাতে গাছে উঠলেন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা

জীবন বাঁচাতে নারীর গাছে ওঠার দাবিতে ছড়ানো ছবি। ছবি: স্ক্রিনশট

চট্টগ্রামে বন্যায় কবলিত হয়ে গর্ভে নয় মাসের সন্তান নিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য একজন মা গাছের ডালে আশ্রয় নিয়েছেন—এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যা নেটদুনিয়ায় রীতিমতো আলোড়ন তৈরি করেছে।

আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ের অনুসন্ধানে ‘Joynal Anjana Vlogs’ নামের একটি ফেসবুক পেজে শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই শেয়ার করা ওই ভিডিওর সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটির ক্যাপশনে ‘টাঙ্গুয়ার হাওরে...’ লেখা রয়েছে।

পর্যবেক্ষণ জানা যায়, ভিডিওতে থাকা নারী কোনো বিপদে পড়ে গাছে ওঠেননি। তিনি মূলত সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গিয়ে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে পানির মধ্যে থাকা একটি গাছের ডালে হেলান দিয়ে পোজ দিচ্ছিলেন। এ ছাড়া ওই ভিডিওতে আরও লোকজন এবং হাউস বোট স্পষ্ট দেখা যায়। অর্থাৎ, ছড়িয়ে পড়া দাবিটি সঠিক নয়।

কম্পেরিজন।

সিদ্ধান্ত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত দাবিগুলো বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর এবং প্রেক্ষাপটহীন। পাকিস্তান, বান্দরবান, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং ২০২৪ সালের বন্যার ভিডিওকে সাম্প্রতিক চট্টগ্রামের বন্যার সঙ্গে জুড়ে প্রচার করা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com

গলাপানিতে দুই শিশুসন্তানকে বাবার আগলে রাখার ভিডিওটি পুরোনো

‘জাহেলি যুগকেও হার মানায়’ ক্যাপশনে ছড়ানো ভিডিওটি আসামের

২ লাখ ৪২ হাজার বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া—দাবিটি সঠিক নয়

পশ্চিমবঙ্গে কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে বাংলাদেশের বলে প্রচার

পলাশবাড়ীতে রাম মূর্তি নির্মাণ: ভারতীয় অ্যাকাউন্ট থেকে প্রোপাগান্ডা, ধোনির ২ কোটি টাকা সহায়তার দাবি

‘মাঝপথে আ.লীগকে নিয়ে আরেকটি নির্বাচন হবে’—টিআইবির ড. ইফতেখারুজ্জামান এমন মন্তব্য করেননি

অভিনেত্রী শাওন গ্রেপ্তারের খবরটি ভুয়া

ডে-কেয়ার সেন্টারে শিশুর মারধরের ভিডিওটি বাংলাদেশের নয়

বাংলাদেশে পুশ ইনের চেষ্টার ভিডিওকে ছড়ানো হচ্ছে ‘ভারতে অনুপ্রবেশের’ ঘটনা বলে

সাঙ্গু নদী থেকে উদ্ধার শিশু আরেফিনকে তুরাগে ছাত্রলীগ কর্মীর লাশ বলে দাবি