গাঁজা ব্যবসায়ীকে শাস্তি দিচ্ছেন মাদারীপুরের নতুন এমপি—এমন দাবিতে সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে মারধর করতে দেখা যায়। মুহূর্তেই এটি ভাইরাল হয়ে যায়।
আলোচিত দাবিতে ফেসবুকে পোস্ট রয়েছে এখানে, এখানে এবং এখানে
Tahmina Rahman Khan নামের আইডি থেকে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ২টা ৪৪ মিনিটে ভিডিওটি শেয়ার করা পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘হাজী শরীয়তুল্লাহর বংশধর, মাদারীপুর-১ আসনে খেলাফত মজলিস থেকে নবনির্বাচিত এমপি পীরজাদা হানজালার অ্যাকশন নিতে দেখেন! দেশ গড়ার জন্য আলেমদের ভূমিকা কেন বেশি প্রয়োজন, তা আশা করি বুঝেছেন। গাঁজা ব্যবসায়ীদের মেরে লাল করে দিচ্ছে।’
পোস্টের কমেন্ট যাচাই করে দেখা যায়, বেশিরভাগ কমেন্টে প্রচারিত দাবিকে সমর্থন জানানো হয়েছে। কেউ লিখেছেন, ‘ইনশাআল্লাহ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য ধন্যবাদ।’ কেউ আবার বলেছেন, ‘তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে আরও ভালো হতো। ধন্যবাদ।’ তবে কেউ কেউ দাবি করেছেন, ‘ভিডিওটি অনেক আগের।’
১৪ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা ১৯ মিনিটে Mim Islam নামের একটি পেজ থেকে একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে মাদারীপুরের শিবচরের ঘটনাকে শরীয়তপুরের নতুন এমপির ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘খেলা দেখুন, গাঁজা ব্যবসায়ীকে শাস্তি দিচ্ছেন শরীয়তপুরের নতুন এমপি।’ তবে পোস্টের মন্তব্যে একজন উল্লেখ করেন, ঘটনাটি শরীয়তপুরের নয়, বরং মাদারীপুরের।
আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করেছে আজকের পত্রিকার ফ্যাক্টচেক টিম। ১ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি ও সাদা টুপি পরা এক দাঁড়িওয়ালা ব্যক্তি পর্যায়ক্রমে তিনজনকে লাঠি দিয়ে আঘাত করছেন। একই ধরনের পোশাক ও পাগড়ি পরা আরেকজনকে মারধরের শিকার ব্যক্তিদের নিচের দিকে ধরে রাখতে দেখা যায়। ভিডিওতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সাদা পোশাকধারী দুজনকে নির্দেশনা দিতে দেখা যায়।
প্রচারিত লাল রঙের ফটোকার্ডটিও যাচাই করে দেখা যায়, এতে কোনো গণমাধ্যমের লোগো নেই। কার্ডটির বাম পাশে ‘ছবিটি সংগৃহীত’ লেখা রয়েছে।
অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এর ইউটিউব চ্যানেলে ‘মাদক কিনতে আসা ৪ যুবককে জুতাপেটা ও কান ধরে উঠবস’ শিরোনামে একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যার সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওটির মিল রয়েছে। যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি সাম্প্রতিক নয়; এটি ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট প্রকাশিত।
এ বিষয়ে আরও অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল সময় টিভির ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট ‘মাদক কিনতে আসা ৪ যুবককে জুতাপেটা ও কান ধরে উঠবস’, শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ঘটনাটি ২২ আগস্ট ঘটলেও ২৫ আগস্ট দুপুরে বিষয়টি জানাজানি হয়। এ সময় দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবককে কান ধরে উঠবস করানো হচ্ছে। পরে তাঁকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এমনকি ওই যুবককে নিজের গালে জুতাপেটা করতে বাধ্য করা হয়। অন্য ভিডিওতে দেখা যায়, একে একে তিন যুবককে লাঠি দিয়ে মারধর করা হচ্ছে। পরে তাঁদের কান ধরে উঠবস করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। ভবিষ্যতে কেউ এলাকায় মাদক কিনতে এলে উলঙ্গ করে ঝুলিয়ে রাখার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে অভিযোগ অস্বীকার করে পীরজাদা আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মো. মোহসেন বলেন, তাঁরা কাউকে মারধর বা জুতাপেটা করেননি, বরং ভয় দেখিয়েছেন। এলাকাকে মাদকমুক্ত রাখতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় ‘মাদক কিনতে আসা ৪ যুবককে জুতাপেটা করলেন দুই পীরজাদা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর-এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সম্প্রতি বিষয়টি আবার আলোচনায় এলে পীরজাদা হানজালা তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে তিনি একটি পোস্টে বলেন, ভিডিওটি ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ের ঘটনা। সে সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই স্থানীয়ভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন বলেও উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলেন। তিনি রিকশা প্রতীকে ৬৪ হাজার ৯০৯ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার ধানের শীষ প্রতীকে পান ৬৪ হাজার ৫২৪ ভোট।