স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পশ্চিমাঞ্চলে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবানল থেকে যখন প্রাণভয়ে এলাকা ছাড়ছিলেন শত শত মানুষ, ঠিক তখনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদাপন্ন প্রাণীদের বাঁচাতে দাঁড়িয়ে যান একদল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও উদ্ধারকারী।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাবানলের আগুনে প্রায় ১৩১ বর্গমাইল এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও, ‘সাফারি পার্ক’ এবং স্থানীয় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণাগারগুলোর কর্মীদের সাহসিকতায় রক্ষা পেয়েছে সিংহ, হাতি, নেকড়ে, শকুনসহ সহস্রাধিক দেশি ও বিদেশি বন্যপ্রাণী।
মাদ্রিদ থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পশ্চিমে সান মার্টিন ডি ভালদেইগলেসিয়াস এলাকায় একটি ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াইয়ের মাঠকে (বুলরিং) রাতারাতি রূপ দেওয়া হয় ঘোড়া, গাধা, ছাগল, কুকুর ও বিড়ালের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে।
একই সঙ্গে স্পেনের বেসামরিক বাহিনী ‘সিভিল গার্ড’ গৃহপালিত ও খামারের পশুদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার বড় অভিযান পরিচালনা করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা জানায়, প্রজাতি যাই হোক না কেন, আমরা কাউকেই বিপদের মুখে ফেলে আসব না।
মাদ্রিদের পশ্চিমে অবস্থিত ‘সাফারি মাদ্রিদ’-এর দিকে যখন দাবানলের বিষাক্ত ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখা ধেয়ে আসছিল, তখন পার্কের প্রায় ১ হাজার প্রাণীকে বাঁচাতে সেখানে অবস্থান করেন কেয়ারটেকাররা।
আগুনের ছোঁয়া থেকে বাঁচাতে প্রাণীদের কংক্রিটের তৈরি এয়ারকন্ডিশন্ড কক্ষে আটকে রাখা হয় এবং চারপাশের জমি অনবরত পানি দিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া হয়।
সাফারি পার্কের মুখপাত্র হোসে লুইস ক্যানো বেসেরো জানান, আগুন একপর্যায়ে তাদের মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল। তবে কর্মীরা টানা দুই রাত জেগে পাহারা দিয়েছেন যাতে কোনো জ্বলন্ত কাঠের টুকরো থেকে নতুন করে আগুন না ছড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘ সময় ছোট ঘরে অবরুদ্ধ থাকায় কিছু প্রাণী অস্থির হয়ে পড়েছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে এশীয় কিশোর বয়সের পুরুষ হাতিগুলো কিছুটা অশান্ত হয়ে পড়েছিল, তবে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। অবশেষে আমরা পার্কটি দর্শনার্থীদের জন্য আবার খুলে দিতে পেরেছি।’
সাফারি পার্ক কেবল নিজস্ব প্রাণী নয়, বরং নিকটবর্তী ‘কুনা ইবেরিকা’ নামক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণাগারের বিপদাপন্ন প্রাণীদেরও আশ্রয় দিয়েছে।
আগুন যখন অভয়ারণ্যের মাত্র ১০ মিটারের মধ্যে চলে আসে, তখন সেখান থেকে ইউরেশীয় লিনক্স এবং ইবেরিয়ান নেকড়েকে চেতনানাশক দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। বেশ কিছু দুর্লভ শকুন ও শিকারি পাখিকে নেওয়া হয় স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং অন্য একটি উদ্ধার কেন্দ্রে।
কুনা ইবেরিকার পরিচালক আইজ্যাক নাভারো বলেন, ‘আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল—যতটা সম্ভব প্রাণীদের অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি আমরা আগে কখনো হইনি।’
সংরক্ষণাগারের যেসব প্রাণীকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি, তাদের খাঁচা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা সাময়িকভাবে পালিয়ে বাঁচতে পারে। বুনো পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারা এসব উদ্ধারকৃত প্রাণী পরদিন সকালে ঝুঁকি কমতেই নিজে থেকে তাদের চেনা ঘরে ফিরে আসে।
বর্তমানে অধিকাংশ প্রাণীকে তাদের স্বাভাবিক বসতি বা অভয়ারণ্যে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে দাবানলের আগুনে পুরো এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বনভূমি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে উদ্ধারকর্মীদের মনে।
আইজ্যাক নাভারো আক্ষেপ করে বলেন, ‘পুরো এলাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দেখে মন খারাপ হলেও, অন্তত এটুকু স্বস্তি যে, আমাদের একটি প্রাণীরও কোনো ক্ষতি হয়নি।’
দাবানল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এলেও ধোঁয়া ও সম্ভাব্য আগুনের ঝুঁকির কারণে এখনো সতর্কাবস্থায় রয়েছেন স্পেনের বন্যপ্রাণী কর্মীরা।