বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী। তাঁর নিজস্ব ড্রামা কোম্পানি ছিল। ছোটবেলায় বাবার ড্রামা কোম্পানির সঙ্গে মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়েছিলেন লতা-আশাসহ পুরো পরিবার। বাবার সূত্রে গানের চর্চা ছিল পুরো পরিবারে। এই গানই পরবর্তী সময়ে হয়ে ওঠে তাঁদের একমাত্র অবলম্বন।
আশার বয়স যখন ৯, তখন বাবাকে হারান। দীননাথ সন্তানদের দিয়ে গিয়েছিলেন একটি তানপুরা। বলেছিলেন, ‘আমার কাছে আর কিছু নেই। এটা আছে। এটা আমি তোমাদের দিয়ে যাচ্ছি। একে সামলে রেখো। মন দিয়ে গান করো।’ বাকি জীবন বাবার সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন লতা, আশাসহ পাঁচ ভাইবোন।
আশা ভোঁসলে বলেন, ‘বাবা যখন চলে যান, তখন আমরা খুবই ছোট। দিদি গান করতে শুরু করেন। দিদির সঙ্গে আমিও গান গাওয়া, ঘরের কাজ করা, মায়ের দেখভাল শুরু করি। আমরা পরিশ্রম করেছি বলেই আমরা এত কিছু অর্জন করতে পেরেছি। যদি বাবা আমাদের অনেক কিছু দিয়ে যেতেন, তাহলে হয়তো কিছুই হতো না।’
বাবা চলে যাওয়ার পর পরিবারের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব এসে পড়ে লতা মঙ্গেশকর ও আশার ওপর। একটু একটু করে সিনেমায় গান গাওয়ার সুযোগ পেতে থাকেন লতা। ১৯৪০-এর দশকের শেষদিকে দুই বোন একসঙ্গে সংগীতজগতে প্রবেশ করলেও, লতা দ্রুত শীর্ষে পৌঁছে যান। তবে প্লেব্যাকে নিজের জায়গা তৈরি করতে যথেষ্ট সংগ্রাম করতে হয় আশাকে।
ওই সময় নিজেকে ভিন্নভাবে গড়তে শুরু করেন আশা ভোঁসলে। তিনি উপলদ্ধি করেন, তাঁর গায়কি লতার মতো হলে কখনো নিজের জায়গা তৈরি করতে পারবেন না। বিষয়টি নিয়ে আশা বলেন, ‘ছোট বোন সব সময় বড় বোনকে নকল করে। আমিও ছোটবেলায় দিদির মতো করে গাওয়ার চেষ্টা করতাম। এক সময় মনে হলো, লতা মঙ্গেশকর নামটি এত বড় হয়ে গেছে, তাঁর মতো করে গাইলে আমার তো নিজস্ব অবস্থান তৈরি হবে না। তাই গানগুলো ভিন্নভাবে গাওয়া শুরু করি। এলভিস প্রিসলিসহ বিদেশি শিল্পীদের গান শুনে অনেক কিছু আয়ত্ব করি।’
এভাবে ধীরে ধীরে লতা মঙ্গেশকরের ছায়া থেকে বেরিয়ে নিজের আলাদা ঘরানা তৈরি করেন আশা ভোঁসলে। ক্যাবারে থেকে গজল, পপ থেকে ক্লাসিক্যাল—তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরিত হয়েছে সবক্ষেত্রে।
অন্তিমে এসে লতা ও আশা দুজনেই মিললেন এক বিন্দুতে। ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লতা যেদিন চলে যান, সেদিন ছিল রোববার। আশার মৃত্যু দিনটিও রোববার। মৃত্যুর স্থানও এক— মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতাল। দুজনেই ৯২ বছর বয়সে জীবনের যাত্রা সাঙ্গ করলেন। যেন তাঁরা দুজনে নিজেদের সুরের যাত্রা সম্পূর্ণ করে, ঠিক একই সংখ্যায় এসে বিরতি নিলেন।