ভারতীয় সংগীতজগতের কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। তাঁর চিরসবুজ ও বহুমাত্রিক কণ্ঠে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতাদের মোহিত করা এই শিল্পী আজ রোববার ৯২ বছর বয়সে মারা গেছেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
আশা ভোঁসলের ছেলে আনন্দ ভোঁসলে মায়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, ‘তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। আগামীকাল বিকেল ৪টায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।’
অসুস্থতার খবর জানিয়ে আশা ভোঁসলের নাতনি জানাই ভোঁসলে ইনস্টাগ্রামে লিখেছিলেন, ‘আমার দাদি আশা ভোঁসলে অতিরিক্ত ক্লান্তি ও বুকে সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমরা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান জানাতে অনুরোধ করছি। তাঁর চিকিৎসা চলছে এবং আশা করছি, সবকিছু ভালো হবে। আমরা শিগগির ইতিবাচক খবর জানাব।’
ভারতীয় সংগীতের অন্যতম আইকনিক ও বহুমুখী প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে সুপরিচিত আশা ভোঁসলে। আট দশকের বেশি দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি একাধিক ভারতীয় ভাষার পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি ভাষাতেও হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, পপ থেকে গজল—বিভিন্ন ধারার সংগীতে অসাধারণ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
দীর্ঘ কর্মজীবনে ভারতীয় সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আশা ভোঁসলে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন এবং ‘পদ্মবিভূষণ’ও অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছেন, যা তাঁকে ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও সর্বাধিক সম্মানিত কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
আশা ভোঁসলে ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে বহুমুখী ও দীর্ঘস্থায়ী কণ্ঠশিল্পীদের একজন। ১৯৪০-এর দশকে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয়। শুরুটা ছিল সংগ্রামের। কারণ, বড় বোন লতা মঙ্গেশকর ইতিমধ্যে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিষ্ঠিত। প্রথম দিকে ছোট বাজেটের চলচ্চিত্রে গান গেয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখেন, কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে সুরকার ওপি নায়ারের সঙ্গে কাজ করে তিনি আলাদা পরিচিতি পান। পরে আরডি বর্মণের সঙ্গে তাঁর কাজ ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে নতুন ধারা তৈরি করে, যেখানে আধুনিকতা, পাশ্চাত্য প্রভাব আর পরীক্ষাধর্মী সুরের মিশ্রণ দেখা যায়।
আশা ভোঁসলে প্রায় সব ধরনের গানেই স্বচ্ছন্দ—ক্ল্যাসিক্যাল, গজল, পপ, ক্যাবারে থেকে শুরু করে লোকগান পর্যন্ত। তাঁর কণ্ঠে ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘ইন আঁখো কি মস্তি’—এর মতো গানগুলো কালজয়ী হয়ে আছে।
তিনি হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন, শুধু হিন্দি নয়, বহু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাষাতেও গান গেয়েছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন। যার মধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানগুলোর একটি—পদ্মবিভূষণও রয়েছে। সাত দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয়তা শুধু মুহূর্তের বিষয় নয়, এটা একধরনের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব, যা সময়কে অতিক্রম করে টিকে থাকে।