২০১৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল তৌকীর আহমেদ পরিচালিত সিনেমা ‘অজ্ঞাতনামা’। মধ্যপ্রাচ্যে নিহত এক বাঙালির লাশ দেশে আনা নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা, সেই ছোট জটিলতার বিশাল রূপ ধারণ, ভুক্তভোগী পরিবারের দুর্দশা, অপরিমেয় আক্ষেপের এক সহজ-সরল চিত্রায়ণ অজ্ঞাতনামা। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রশংসিত হয় ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুজ্জামান সেলিম, মোশাররফ করিম অভিনীত সিনেমাটি। এবার অজ্ঞাতনামা আসছে মঞ্চে। এমনটা নিজেই জানালেন তৌকীর আহমেদ।
গত ৫ মার্চ ছিল তাঁর ৬০তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে ১৯ এপ্রিল রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজন করা হয় ‘ছয় দশক পেরিয়ে তৌকীর আহমেদ: আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পীর দায়’ শীর্ষক দিনব্যাপী অনুষ্ঠান। সুহৃদের আয়োজনে বেলা ১১টা ৩০ মিনিটে শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ‘আমাদের সংস্কৃতি ও শিল্পীর দায়’ শীর্ষক সেমিনার। এই সেমিনারে অজ্ঞাতনামা মঞ্চে নিয়ে আসার কথা জানান তৌকীর। এ বছরেই নাটকের দল নাট্যকেন্দ্র মঞ্চে আনবে অজ্ঞাতনামা। এ ছাড়া এ বছরের শেষ নাগাদ নতুন সিনেমার কাজ শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন তৌকীর আহমেদ। পাশাপাশি আবুল হায়াতকে কেন্দ্র করে একটি কাজ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন তিনি।
সেমিনারে অংশ নেন সংস্কৃতি অঙ্গনের নির্মাতা, শিল্পী ও সংগঠকেরা। তৌকীর আহমেদের নির্দেশিত মঞ্চনাটক নিয়ে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাসুম রেজা। তৌকীর আহমেদকে নিয়ে কথা বলেন মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, আফজাল হোসেন, গাজী রাকায়েত, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, মাহফুজ আহমেদ, মীর সাব্বির, আহসান হাবিব নাসিম, দীপা খন্দকারসহ অনেকে।
অনুষ্ঠানে সহকর্মীদের কাছ থেকে নিজের কথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তৌকীর। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সবার কাছে খুব কৃতজ্ঞ আমাকে এই সম্মান দেওয়ার জন্য। যখন আমাকে এই আয়োজনের পরিকল্পনার কথা জানানো হলো; তখন বলেছিলাম, নিজেকে মরহুম মনে হচ্ছে। এই যে জীবিত অবস্থায় কথা শুনতে পাওয়া, এটা শুধু সৌভাগ্যেরই না, অনুপ্রেরণারও।’
তৌকীর আহমেদ পরিচালিত সর্বশেষ সিনেমা ‘স্ফুলিঙ্গ’। ২০২১ সালে মুক্তি পেয়েছিল এটি। টিভি নাটক ও মঞ্চেও এখন নিয়মিত নন তিনি। সেই প্রসঙ্গে তিনি জানান, শুধু অর্থের পেছনে না ছুটে সৃজনশীল কাজ করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, আজকের সমাজে মানুষ অ্যাংজাইটি, স্ট্রেসসহ নানান ধরনের সমস্যায় ভুগছে। সেখান থেকেও মানুষকে রক্ষা করতে পারে সৃজনশীল কাজ। তৌকীর আহমেদ বলেন, ‘বাণিজ্যিক সিনেমা বানালে হয়তো বেশি চলবে, বেশি উপার্জন হবে। কিন্তু আমি চাই আমার অধিকারটা থাকুক। আমি আমার মতো করে সিনেমা বানাব। আরেকজন যদি অন্যভাবে বানাতে চায়, সেটাও যেন তার অধিকার হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রকে সেই ক্ষেত্রটি অবারিত করতে হবে।’
তৌকীর আহমেদ আরও বলেন, ‘আমরা শিল্পীরা অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি কিংবা সব সময় কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। কিন্তু আমাদের দায়িত্ব বা দায়বদ্ধতা অস্বীকার করতে পারি না। এই কারণেই হয়তো আমরা মঞ্চে ফিরে যাই, কেননা ওইখানে বোধ হয় কিছুটা স্বাধীনতা বোধ করি। কিন্তু আসলেই কি তাই। যখন আপনি হল বরাদ্দ পাচ্ছেন না, কিংবা মাসে একটি শো করতে পারছেন, আবার তিন মাস পর আরেকটি শো। সারা বাংলাদেশের থিয়েটারের অবস্থাও আমরা জানি। আমার মনে হয়, একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বা যুদ্ধের সূচনা করা উচিত। সেখানে আমরা শিক্ষা এবং সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দিতে চাই।’
ছয় দশক পেরিয়ে তৌকীর আহমেদ শিরোনামের অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় ভাগে জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে বিকেল ৪টায় প্রদর্শিত হয় অজ্ঞাতনামা। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে একই স্থানে প্রদর্শিত হয় তৌকীর আহমেদ নির্দেশিত মঞ্চনাটক ‘তীর্থযাত্রী’। নাটকটি মঞ্চায়ন করে নাট্যকেন্দ্র।