কান চলচ্চিত্র উৎসবকে বলা হয় ‘বড় পর্দার অলিম্পিক’। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিচালক, প্রযোজক, সেলস এজেন্ট ও সাংবাদিকেরা হাজির হন এ উৎসবে। নির্মাতারা আসেন তাঁদের সিনেমা দেখাতে। সেসব বিক্রির প্রক্রিয়া চলে। নতুন সিনেমার জন্য খোঁজা হয় প্রযোজক। সব মিলিয়ে উৎসবটি হয়ে ওঠে সিনেমা প্রদর্শনী ও বিকিকিনির এক মহামিলন। আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই চলচ্চিত্র উৎসব। ৭৯তম কান চলচ্চিত্র উৎসব ১২ মে থেকে শুরু হয়ে চলবে ২৩ মে পর্যন্ত। এবার উৎসবের পর্দা উঠবে ফরাসি পরিচালক পিয়ের সালভাদোরির ‘দ্য ইলেকট্রিক কিস’ সিনেমার মাধ্যমে। আজীবন সম্মাননা হিসেবে অনারারি পাম দ্যর পাচ্ছেন ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’খ্যাত পরিচালক পিটার জ্যাকসন এবং কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও গায়িকা বারবারা স্ট্রাইস্যান্ড।
এবারের প্রতিযোগিতায় এশীয় ও ইউরোপীয় নির্মাতাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ বছর স্বর্ণপাম জেতার লড়াইয়ে আছে ২২টি সিনেমা। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ান নির্মাতা না হোং জিনের ‘হোপ’ এবং আসগর ফারহাদির ‘প্যারালাল টেলস’ নিয়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক জল্পনা চলছে। উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় আরও আছে জেমস গ্রের ‘পেপার টাইগার’, পেদ্রো আলমোদোভারের ‘আমার্গা নাভিদাদ’, হিরোকাজু কোরে-এদার ‘শিপ ইন দ্য বক্স’ ও রয়সুকে হামাগুচির ‘অল অব আ সাডেন’।
এবারের কান উৎসবের মূল প্রতিযোগিতার জুরিপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় পরিচালক পার্ক চ্যান-উক। কানের ইতিহাসে এটি প্রথম কোনো কোরীয় পরিচালকের জুরিপ্রধান হওয়ার রেকর্ড। তাঁর সঙ্গে বিচারক প্যানেলে আরও থাকবেন হলিউড অভিনেত্রী ডেমি মুর, আইরিশ অভিনেত্রী রুথ নেগা, অস্কারজয়ী চীনা পরিচালক ক্লোয়ে ঝাও, সুইডিশ অভিনেতা স্টেলান স্কার্সগার্ড, বেলজিয়ান পরিচালক লরা ওয়ান্ডেল, চিলির পরিচালক দেয়েগো সেসপেদেস, আইভোরীয়-আমেরিকান অভিনেতা ইসাক ডি বাঙ্কোলে ও স্কটিশ চিত্রনাট্যকার পল ল্যাভার্টি। ২৩ মে উৎসবের সমাপনী আয়োজনে সেরা সিনেমার নাম ঘোষণা করবেন তাঁরা।
বিশ্ব চলচ্চিত্রে নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে আরব। সৃজনশীলতা, শক্তিশালী কাহিনি এবং আধুনিক নির্মাণের মাধ্যমে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন আরব নির্মাতারা। ৭৯তম কান উৎসবের লালগালিচায় এবার আরব বিশ্বের নির্মাতাদের বিশেষ আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামাজিক পরিবর্তন, নারী অধিকার এবং মানবিক সংকট নিয়ে নির্মিত একাধিক সিনেমা এবারের উৎসবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে স্থান পেয়েছে।
স্বর্ণপামের জন্য লড়ছে মিসরীয়-ফরাসি নির্মাতা আর্থার হারারির ‘দ্য আননোন’। একই বিভাগে রয়েছে ইরানি পরিচালক আসগর ফারহাদির ‘প্যারালাল টেলস’। আঁ সাঁর্তে রিগা বিভাগে আছে মরক্কোর পরিচালক লায়লা মাররাকচির ‘লা মাস দুলসে’ ও ফিলিস্তিনি নির্মাতা রাকান মায়াসির ‘ইয়েস্টারডে দ্য আই ডিডন্ট স্লিপ’। ক্রিটিকস উইকে প্রদর্শিত হবে লেবানীয় পরিচালক আলী চেরির ‘দ্য সেন্টিনেল’ ও সিরিয়ান পরিচালক দাউদ আল আবদুল্লাহর ‘নাফরন’।
এবারের উৎসবের ক্রিটিকস উইক বিভাগের জুরিপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ভারতীয় নির্মাতা পায়েল কাপাডিয়া। ২০২৪ সালে তাঁর সিনেমা ‘অল উই ইমাজিন অ্যাজ লাইট’ গ্র্যান্ড প্রিক্স জেতার পর এটি ভারতের জন্য এক বিশাল অর্জন। দক্ষিণ এশিয়ার জন্য আরেকটি গর্বের বিষয় হলো নেপালি নির্মাতা অবিনাশ বিক্রম শাহের সিনেমা ‘এলিফ্যান্টস ইন দ্য ফগ’। এটি প্রথম কোনো নেপালি সিনেমা হিসেবে আঁ সাঁর্তে রিগা বিভাগে স্থান পেয়েছে।
ভারতের একটি বিশাল প্রতিনিধিদল অংশ নিচ্ছে এবার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন পরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকর। থাকবেন ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন, আলিয়া ভাট, করণ জোহর, অদিতি রায় হায়দারি, কল্যাণী প্রিয়দর্শন, তারা সুতারিয়া, মৌনি রায় প্রমুখ। মালয়ালম পরিচালক চিদাম্বরম তাঁর ‘বালান: দ্য বয়’ এবং অভিনেত্রী মানসী পারেখ তাঁর গুজরাটি প্রজেক্ট নিয়ে কান ফিল্ম মার্কেটে অংশ নিচ্ছেন।
গত বছর বাংলাদেশি পরিচালক আদনান আল রাজীবের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘আলী’ স্পেশাল মেনশন অ্যাওয়ার্ড জিতে ইতিহাস গড়েছিল। এবার বাংলাদেশের কোনো সিনেমা না থাকলেও দেশের কয়েকজন নির্মাতা এবং প্রযোজক কান ফিল্ম মার্কেটে বিভিন্ন প্রজেক্ট পিচ করবেন বলে জানা গেছে।
৭৯তম কান উৎসব কেবল চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী নয়, বরং হতে যাচ্ছে সমসাময়িক বিশ্বের রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের এক শৈল্পিক প্রতিফলন। দক্ষিণ কোরিয়ার নেতৃত্ব এবং এশীয় সিনেমার জোরালো উপস্থিতি এবারের কানকে নিয়ে যাবে এক নতুন উচ্চতায়, দেবে নতুন সম্ভাবনার বার্তা।