সিনেমার প্লেব্যাকে একসময় একচেটিয়া রাজত্ব করেছেন রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় তাঁর মায়াবী কণ্ঠ ছড়িয়ে আছে অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায়। তবে গত প্রায় এক দশক সিনেমার গানে পাওয়া যায়নি জনপ্রিয় এই সংগীতশিল্পীকে। দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে প্রায় ৯ বছর পর আবারও সিনেমায় প্লেব্যাক করলেন কনকচাঁপা। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন শিহাব আহমেদ।
দিন-তারিখ নিখুঁতভাবে মনে নেই, তবে ৮-৯ বছর তো হবেই। শেষ গেয়েছিলাম ছটকু আহমেদের ‘পাথরের মন’ সিনেমায়। এবার নতুন যে গানটি গাইলাম, তার শিরোনাম ‘রাজকুমারী’। গানটি ব্যবহৃত হবে ‘নসীব’ নামের একটি সিনেমায়। এর কথা লিখেছেন কবির বকুল আর সুর করেছেন কিশোর দাস। এটি মূলত একটি দ্বৈত গান, যেখানে আমার সঙ্গে কণ্ঠ দেবেন কুমার বিশ্বজিৎ দাদা। তিনি কানাডা থেকে গানটিতে ভয়েস দেবেন।
এই সময়ে যে আমার কাছে সিনেমার গানের প্রস্তাব আসেনি, বিষয়টি তেমন নয়। সত্যি বলতে, আমার নিজেরই আর ইচ্ছা করছিল না। মানুষের কাজের স্পৃহা বা কর্মচঞ্চলতার যে একটা ব্যাপার থাকে, আমি সেদিক থেকে কোনো উৎসাহ পাচ্ছিলাম না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমি যাঁদের সুরে সবচেয়ে বেশি গান করেছি, তাঁদের অনেকে এখন আর বেঁচে নেই। যে সব স্টুডিওতে গান রেকর্ড করতাম, সেগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে; রেকর্ডিস্ট মারা গেছেন। আমাদের যে একটা সুন্দর জগৎ ছিল, সেটা যেন হারিয়ে গেছে। মনে হতো, সেই পুরোনো জগৎটা নেই আর আমি একা পড়ে আছি। এই শূন্যতার অনুভূতি থেকেই প্লেব্যাক করা হয়ে ওঠেনি। অনেক সময় গান শোনার পর ফিরিয়ে দিয়েছি, আবার কখনো না শুনেই ‘না’ করে দিয়েছি।
মূল কারণ, গীতিকার কবির বকুল। এর আগেও সে বহুবার আমাকে গাওয়ার জন্য বলেছে। কিন্তু এবার আর ‘না’ করতে পারিনি। সে বারবার বলছিল, ‘আপনি আর অভিমান করে থাকবেন না। কণ্ঠ যত দিন আছে, কাজ করে যান।’ তার কথাগুলো ভেবেই শেষমেশ রাজি হলাম। তা ছাড়া গানটাও বেশ সুন্দর। শোনার পর মনে হলো, গানটা গাওয়াই যায়।
রেকর্ডিংয়ের জন্য যখন দাঁড়ালাম, হেডফোনটা কানে দিলাম; সেই মুহূর্তের অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কিছু অনুভূতি থাকে, যা বলে বোঝানো যায় না। শুধু মনে হচ্ছিল, কত দিন পর রেকর্ডিং করছি! এমনিতে আমি নিয়মিত মঞ্চে গান গাইছি, কিন্তু স্টুডিও রেকর্ডিংয়ের বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। রেকর্ডিংয়ের সময়টা শিল্পীর জন্য বিশেষ একটা মুহূর্ত। আমি ভীষণ ইমোশনাল হয়ে পড়ছিলাম, কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছি। ভাবছিলাম, একবার যদি ইমোশনাল হয়ে যাই, তাহলে গানটাই গাওয়া মুশকিল হয়ে পড়বে। অশ্রুসিক্ত হতে হতেই নিজেকে সামলে নিই। এরপর নিজেকে শক্ত করে গাইলাম। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে চিরচেনা নিজেকে যেন আবারও নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। অনেক জমানো কথা বুকের ভেতর বুদবুদের মতো উঠে আসছিল।
একটা সময় ছিল যখন সর্বভুকের মতো কাজ করেছি। যার যে রকম এক্সপেরিমেন্টের গান ছিল, সব গেয়েছি। আমার টাইপের বাইরের গানও গেয়েছি। মোটকথা, সব ধরনের গানই গাওয়া হয়েছে। সেটা একটা নির্দিষ্ট পর্ব ছিল। এখন আমি গান গাইলে অবশ্যই বেছে বেছে গাইব। গানটা ভালো হতে হবে, গানের কথা সুন্দর হতে হবে, সুর ও অ্যারেঞ্জমেন্ট ভালো হতে হবে। এটুকু বাছাবাছির সময় বা বয়স তো আমার হয়েছে! এখন যাচ্ছেতাই বা যা খুশি গাইলে তো চলবে না। শুধু আমি কেন, আমরা যারা প্লেব্যাক করি, এমন অনেক গান গেয়েছি—যেগুলো না গাইলেও চলত। তখন গেয়েছি, কিন্তু এখন আর সেটা করব না। এখন খুব ভালো গান পেলেই শুধু গাইব।
এখন যারা সিনেমায় গাইছে, তারা অবশ্যই ভালো গায়। তাদের জন্য আমার শুভাশিস ও শুভকামনা। সব সময় আশীর্বাদ করি, তারা যেন অনেক মেলোডিয়াস গান গাওয়ার সুযোগ পায়। এমন গান যেন তারা পায়, যা তাদের অমর করে রাখবে।