সাক্ষাৎকার

উচ্চতর গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলেছে ইউজিসি

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইউজিসি চেয়ারম্যানের দায়িত্বগ্রহণ করেছেন অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ। ১৪তম চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি তার দায়িত্বগ্রহণের দেড় বছর পূর্ণ করেছেন। দায়িত্বগ্রণের পর থেকে দেশের উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে বেশকিছু বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব বিষয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষার সার্বিক বিষয়ে আজকের পত্রিকাকে তিনি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তার কথাগুলো শুনেছেন ইলিয়াস শান্ত।

ইউজিসি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছর পূর্ণ হলো। এই সময়টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ইউজিসি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছর ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও ঘটনাবহুল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিগত কমিশনের চেয়ারম্যানসহ সকল সদস্য পদত্যাগ করেন, যার ফলে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি অস্বাভাবিক ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন বাস্তবতায় বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রাথমিকভাবে একজন সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে কমিশনের কার্যক্রম সচল করতে হয় এবং পরবর্তীতে ধীরে ধীরে অন্য সদস্যরা যোগদান করেন। এ সময় বিগত দিনের জমে থাকা কাজের চাপের পাশাপাশি চলমান দায়িত্বগুলো একযোগে সামাল দিতে হয়েছে।

পরিবর্তিত এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের বর্তমান কমিশনের প্রতি ছিল অত্যন্ত উচ্চ প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশাকে দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করেই কমিশন কাজ শুরু করে। গত ১৮ মাসে ইউজিসির মূল ফোকাস ছিল দেশের উচ্চশিক্ষাকে কেবল ডিগ্রি প্রদানের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে গুণগত উৎকর্ষ ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণের সূচনা করেছে, যা ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষার টেকসই উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় কী কী চ্যালেঞ্জ ছিল এবং সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?

দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে সৃষ্ট প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণ এবং স্থবির হয়ে পড়া উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গতি ফিরিয়ে আনা। ওই সময় দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, প্রো-উপাচার্যসহ শীর্ষ প্রশাসনিক পদগুলো শূন্য হয়ে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা দেখা দেয়। এ অবস্থায় বর্তমান কমিশন অগ্রাধিকারভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শীর্ষ পদগুলোতে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পদায়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে, যাতে দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরা সম্ভব হয়।

একই সঙ্গে গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণকারী অসংখ্য শিক্ষার্থী তীব্র মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে বিশেষ কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, যাতে তারা পুনরায় শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী হতে পারে এবং শিক্ষাজীবনে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসে।

এ ছাড়া শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং গবেষণার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাও ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কমিশন এ খাতে নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং গবেষণার জন্য অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। সার্বিকভাবে, প্রশাসনিক পুনর্গঠন, শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষা ও গবেষণার গুণগত উন্নয়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বল্প সময়ের মধ্যেই স্থবির হয়ে পড়া উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন গতি সঞ্চার করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ।

এই সময়ে আপনাদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ও ব্যর্থতা কোনগুলো বলে মনে করেন?

এই সময়ে আমাদের কাজের পথচলায় সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা—দুটিই ছিল। বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলোর একটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে সৃষ্ট নানা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কার্যকর ও দ্রুত সমাধান। কুয়েট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং সর্বশেষ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে উদ্ভূত সংকটকালে ইউজিসির সদস্যরা সরাসরি উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

আরেকটি বড় সাফল্য হলো স্থবির হয়ে থাকা গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে গতি সঞ্চার করা। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট)’ প্রকল্প এবং বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘ইম্প্রুভিং কম্পিউটার অ্যান্ড সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং টারশিয়ারি এডুকেশন প্রজেক্ট (আইসিএসইটিইপি)’—এই দুটি বড় প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে কার্যত স্থবির অবস্থায় ছিল। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্তমান কমিশন প্রকল্প দুটির কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়। এর ফলশ্রুতিতে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে মোট ১৯৬টি উপপ্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থ ছাড় দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

এ ছাড়া একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সংযোগ জোরদারে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। এর মধ্যে হাউস অব লর্ডসে ইউজিসি ও ব্রিটিশ কাউন্সিলের মধ্যে শিক্ষার মানোন্নয়নে চুক্তি অন্যতম। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগও এই সময়ের উল্লেখযোগ্য অর্জন। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সভা-সম্মেলনের আয়োজনের মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা জোরদারের চেষ্টা করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকায় ‘দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলন: উচ্চশিক্ষার অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক একটি সফল আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করা হয়, যেখানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী আঞ্চলিক সম্মেলনটি মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত হবে, যা এই উদ্যোগকে ধারাবাহিক রূপ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই সম্মেলন আয়োজনের ক্ষেত্রে তৎকালীন সরকার ইউজিসিকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেয় এবং অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস বিষয়টি বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রতি এই উদ্যোগের পেছনে একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে সার্ক প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এই অবদান দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বর্তমান কমিশন শিক্ষাবিষয়ক সহযোগিতার মাধ্যমে এই আঞ্চলিক উদ্যোগকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত রাখার প্রয়াস চালাচ্ছে। শিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা জোরদার করা এবং এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

তবে সীমাবদ্ধতাও ছিল। কাঙ্ক্ষিত গতিতে সব সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি। তবু সামগ্রিকভাবে বলা যায়, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর স্থবির হয়ে পড়া উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গতি ফিরিয়ে আনা, বড় প্রকল্পসমূহকে কার্যকর করা এবং শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করাকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করে।

অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ।

নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এই সরকারের অধীনে উচ্চশিক্ষায় নতুন কোনো নীতিগ্রহণ করা হবে কিনা বা এই সরকারের উচ্চশিক্ষানীতি কেমন হবে?

দেশের উচ্চশিক্ষাখাতের সার্বিক উন্নয়ন নিয়ে নতুন শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলনের সঙ্গে ইউজিসির প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে একটি বৈঠকের মাধ্যমেই নীতিনির্ধারণ সম্পন্ন হবে না; এ বিষয়ে ধারাবাহিক ও কাঠামোবদ্ধ আলোচনার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

নতুন মন্ত্রী উচ্চশিক্ষার উন্নয়নে ইউজিসির যৌক্তিক ও বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ বাস্তবায়নে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের কথা বারবার ব্যক্ত করেছেন। সরকার ও ইউজিসি সমন্বিতভাবে কাজ করার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধানের বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে মন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

একই সঙ্গে বর্তমান সরকার সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আগ্রহী বলে ইউজিসিকে অবহিত করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষানীতিও হবে অংশগ্রহণমূলক, সংস্কারমুখী ও শিক্ষার্থীবান্ধব। সার্বিকভাবে বলা যায়, নতুন সরকারের অধীনে উচ্চশিক্ষায় গুণগত রূপান্তর সাধনে ইউজিসি ও সরকার যৌথভাবে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিকাঠামো প্রণয়নের দিকে অগ্রসর হবে।

ইউজিসির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন?

ইউজিসির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হলে সর্বপ্রথম এর আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর যুগোপযোগী সংস্কার প্রয়োজন। একটি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার উৎকর্ষ অনেকাংশেই নির্ভর করে তদারকি প্রতিষ্ঠানের পেশাদারিত্ব, স্বায়ত্তশাসন ও নিরপেক্ষতার ওপর। বর্তমানে ইউজিসি ১৯৭৩ সালের একটি অধ্যাদেশের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, যা বর্তমান সময়ের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এই কাঠামো আধুনিকায়ন করে ইউজিসিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’-এ রূপান্তর করা সময়ের দাবি।

এ লক্ষ্যে ইউজিসি কর্তৃক প্রণীত উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন প্রণয়নের খসড়া ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। এই আইন প্রণয়ন সম্ভব হলে কমিশনের প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা আরও সুসংহত হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করবে।

পাশাপাশি আর্থিক সক্ষমতা ও বরাদ্দ বণ্টনের ক্ষেত্রেও ইউজিসির অধিকতর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বাহ্যিক প্রভাব ছাড়াই কেবল যোগ্যতা, প্রয়োজন ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অর্থায়ন করা যায়। এসব কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে ইউজিসির স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা আরও সুদৃঢ় হবে এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে আশা করা যায়।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। শিক্ষার মানোন্নয়নে ইউজিসির প্রধান অগ্রাধিকার কী?

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনাকে ইউজিসি ইতিবাচক হিসেবেই দেখে, কারণ এটি সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে উদ্বুদ্ধ করে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বর্তমানে শিক্ষার মানোন্নয়নে বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রধান অগ্রাধিকার হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একটি কার্যকর ‘কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স কালচার’ বা গুণগত মান নিশ্চিত করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

এই লক্ষ্য সামনে রেখে ইউজিসি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ল্যাবরেটরি সুবিধা সম্প্রসারণ, গ্রন্থাগারের আধুনিকায়ন এবং পাঠ্যক্রমকে বৈশ্বিক চাহিদা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে গবেষণাকে শুধু পদোন্নতির আনুষ্ঠানিক শর্ত হিসেবে না দেখে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখার মতো করে গড়ে তুলতে বিশেষ বরাদ্দ ও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষকদের জন্য মানসম্মত ও ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতি, গবেষণা সক্ষমতা ও একাডেমিক নেতৃত্বের গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকাংশে পিছিয়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঙ্ক্ষিত অবস্থান অর্জিত না হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে, যার মধ্যে গবেষণার অপর্যাপ্ততা অন্যতম। আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং মূলত গবেষণার পরিমাণ ও গুণগত মান, প্রকাশনার সংখ্যা, উদ্ধৃতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে। এ সব সূচকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে তুলনামূলক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, পাকিস্তানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সার্ক সম্মেলনে অংশগ্রহণের সময় সেখানকার কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন করে লক্ষ্য করা গেছে যে, তারা গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশ হিসেবে পাকিস্তান অনেক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে গেলেও উচ্চশিক্ষায়, বিশেষত গবেষণায়, তারা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছে। এর মূল কারণ হলো গবেষণায় অধিক বিনিয়োগ, শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শীর্ষ মেধাবীদের আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়ে শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে নিয়োগ করা।

এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বলা যায়, আমাদেরও গবেষণাকে উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। এ জন্য গবেষণার জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তোলা, যোগ্য ও প্রতিভাবান গবেষক নিয়োগে প্রণোদনা দেওয়া এবং শিল্পখাত ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণাভিত্তিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গবেষণার ফলাফলকে জাতীয় উন্নয়ন ও বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে ইউজিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে ইউজিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী এবং গুণগত শিক্ষার নিশ্চয়তাকে কেন্দ্র করেই তা প্রণয়ন করা হচ্ছে। ইউজিসির দৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিচ্ছিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; বরং তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজে বিদ্যমান নানা সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের বৈজ্ঞানিক ও টেকসই সমাধান অনুসন্ধান করাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব, আর এই লক্ষ্য অর্জনে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এই প্রেক্ষাপটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ইউজিসির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গবেষণাকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি একটি সুসংহত ও সুনির্দিষ্ট রিসার্চ ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন কেবল পাঠদানকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থেকে জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত হয়, সে লক্ষ্যেই কাজ করা হচ্ছে।

মানোন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ‘একাডেমিক অডিট’ পরিচালনা এবং পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী ও যুগোপযোগী করে হালনাগাদ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাস, ল্যাবরেটরি ও প্রয়োজনীয় একাডেমিক অবকাঠামোর যে ঘাটতি রয়েছে, তা পূরণে কঠোর তদারকি ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

দেশে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করতে পারছে?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪-পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে কয়েকটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে ইউজিসি উদ্বেগ ও দ্বিধার মধ্যে রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে ৪ থেকে ৫ বছর ধরে শিক্ষার্থী তৈরি করছে; ফলে হঠাৎ করে সেগুলো বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে ইউজিসি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় রেখেছে এবং তারা কী ধরনের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, এ বিষয়ে আগ্রহ, সক্ষমতা ও অগ্রগতির মাত্রা মূল্যায়ন করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো, মানোন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও তদারকি নিশ্চিত করা।

সর্বশেষ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নামে ঢাকায় একটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে ইউজিসির পর্যবেক্ষণ জানতে চাই।

সর্বশেষ ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত কলেজগুলো শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল, পরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় যায় এবং পরবর্তীতে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত হয়। বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিস্থিতির কারণে এক পর্যায়ে তারা স্বতন্ত্র কাঠামোর পথে অগ্রসর হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আগ্রহে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় মূলত শিক্ষার্থীদের জন্য। শিক্ষার্থীরা রয়েছে বলেই শিক্ষকসমাজ ও শিক্ষা কার্যক্রম অর্থবহ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে শিক্ষকদের স্বার্থ ও বাস্তবতাকেও উপেক্ষা করা যায় না। তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও সেই নীতিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর সাতটি বড় প্রতিষ্ঠানকে এক প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালনা করা কতটা কঠিন হবে?

রাজধানীর সাতটি বড় প্রতিষ্ঠানকে একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় পরিচালনা করা খুব বেশি কঠিন হবে না। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই কলেজগুলো ইতোমধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময় একই ধরনের প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়েছে। তারা যখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল, তখনও প্রায় একই রকম ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়েছে। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেও তারা অনুরূপ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই ছিল।

বর্তমানে যে নতুন মডেলটি গৃহীত হয়েছে, তা পূর্ববর্তী দুই ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই প্রণীত। তবে গুণগত দিক থেকে এটি আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী। এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো সবগুলো ক্যাম্পাসই একই মহানগর এলাকায় অবস্থিত, যা সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নকে তুলনামূলকভাবে সহজ করে।

বিশ্বের বহু দেশে একাধিক ক্যাম্পাস নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার উদাহরণ রয়েছে। কোথাও একই শহরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ক্যাম্পাস, আবার কোথাও একাধিক শহরজুড়েও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সে অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, রাজধানীর সাতটি বড় প্রতিষ্ঠানকে এক প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত ও ব্যবস্থাপনাগতভাবে সম্ভব, যদি যথাযথ পরিকল্পনা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো অনুসরণ করা হয়।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি দেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আত্মপ্রকাশ বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এতদিন এই সাতটি বড় কলেজ যে প্রশাসনিক দোদুল্যমানতার মধ্যে ছিল, তার স্থায়ী অবসানের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার একটি বিশাল শিক্ষার্থী জনগোষ্ঠীকে একটি সুসংহত কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে। এটি কেবল একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; বরং একটি নতুন একাডেমিক দর্শনের প্রতিফলন। যেহেতু সাতটি ক্যাম্পাসই রাজধানী ঢাকার ভেতরে অবস্থিত এবং প্রত্যেকটির নিজস্ব ঐতিহ্য, অবকাঠামো ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাই নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে তারা পরস্পরের সম্পদ ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার সুযোগ পাবে। এর ফলে শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি দেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে প্রধানত দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। প্রথমত, এটি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের একটি কার্যকর ও বাস্তব উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে বড় আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি আধুনিক ও গতিশীল কাঠামোর আওতায় এনে কীভাবে সেশনজটমুক্ত ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যায়—তার একটি দিকনির্দেশনা তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় (আইডেন্টিটি) গড়ে তুলবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাড়তি আত্মবিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা প্রদান করবে।

উচ্চশিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এই ব্যবধান কমাতে কী করা উচিত?

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের কার্যকর সংযোগ স্থাপন এখন সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞান অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য করে তোলাই হলো এর প্রধান লক্ষ্য। দেশে গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা বাড়লেও কর্মসংস্থানের বাজারে তাদের উপযোগিতা নিয়ে যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এই ব্যবধান কমাতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বর্তমানে ‘আউটকাম বেজড এডুকেশন’বা ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথাগত তাত্ত্বিক শিক্ষার বাইরে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমন কারিকুলাম প্রণয়নের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি সম্পন্ন করার আগেই সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যবহারিক ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

একই সঙ্গে ‘ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়া কোলাবোরেশন’ বা শিল্পখাত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ইন্টার্নশিপ, প্রশিক্ষণ ও হাতে-কলমে কাজের সুযোগ পাবে এবং কর্মবাজারের প্রকৃত চাহিদা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে সক্ষম হবে।

আপনার পুরো মেয়াদের জন্য কী কী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন?

দেশের উচ্চশিক্ষাকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করা এবং বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও গতিশীল প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য। মেয়াদ শেষে আমরা এমন একটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা রেখে যেতে চাই, যেখানে গবেষণার সংস্কৃতি কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নে দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি মেধার উন্নয়নকে আমরা অগ্রাধিকার দিচ্ছি। এজন্য শিক্ষকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ, পিএইচডি গবেষণার জন্য বিশেষ স্কলারশিপ এবং ল্যাবরেটরি ও অন্যান্য গবেষণা সুবিধার আধুনিকীকরণ আমার মেয়াদের শীর্ষ অগ্রাধিকার।

সার্বিকভাবে বর্তমান কমিশন ইউজিসিকে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ও স্মার্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রশাসনিক ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজটমুক্ত শিক্ষাবর্ষ নিশ্চিত করাও বর্তমান মেয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ শুনতে চাই।

প্রথম কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের মান উন্নয়নের জন্য শীর্ষ মেধাবীদের আকৃষ্ট করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য তাঁদের যোগ্যতা ও দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ আকর্ষণীয় বেতন নিশ্চিত করতে হবে। যখন শিক্ষকদের মানসম্মত আয়ের নিশ্চয়তা থাকবে, তখন তারা পাঠদান ও গবেষণার ওপর মনোনিবেশ করতে পারবে এবং অন্য কোনো বিষয়ে বিভ্রান্ত হবেন না। দীর্ঘদিন ধরে চলমান শিক্ষকদের রাজনীতির কোনো প্রথা হঠাৎ করে বন্ধ করা সম্ভব নয়; এজন্য আগে একটি উপযুক্ত একাডেমিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষকদের নিজেদের উপলব্ধি ও সচেতনতা অর্জনের সুযোগ থাকা জরুরি।

শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে, তবে তা শিক্ষার্থীদের ওপর কোনোভাবে প্রভাব ফেলার সুযোগ থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে পাঠদানের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকা আবশ্যক। শিক্ষার্থীদেরকে তাদের মতো করে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিতে হবে এবং কোনো মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এই ধরনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার পরিবেশে শিক্ষক রাজনীতি আপতত দৃষ্টিতে খারাপ কিছু না।

দায়িত্ব শেষে ইউজিসিকে আপনি কোন অবস্থানে দেখতে চান?

আমার বয়স হয়েছে। বাকি সময়ে আমি প্রতিনিয়ত দেশের উচ্চশিক্ষার কল্যাণে কাজ করে যাব। আমার কোনো পদ-পদবির প্রতি মোহ নেই। আমি বিশ্বাস করি, বিশেষ করে উপাচার্য পদে এমন কাউকে আনা যাবে না, যার পদের প্রতি মোহ থাকে। বরং এখানে তার পদের প্রতি সম্মানবোধ থাকা প্রয়োজন। শুধু উপাচার্যই নয়, এমন কোনো পদে যিনি মোহ অনুভব করেন, তাকে আসার দরকার নেই। যারা সম্মানের সঙ্গে দেশ ও শিক্ষার কল্যাণে কিছু করতে চায়, তাদেরই এগিয়ে আসা উচিত। একই সঙ্গে যখনই মনে হবে, এই পদে আমাকে দিয়ে হচ্ছে না, আমি পদ ছেড়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করব না। আমরা ইউজিসি থেকে এমন বার্তা দেশব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছে দিতে চাই।

বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউজিসি একটি উচ্চতর গবেষণার পরিবেশ গড়ে তুলেছে, যেখানে উদ্ভাবিত জ্ঞান জাতীয় অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তিশালী চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। আমি আশা করি, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ইউজিসি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে যাবে।

আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

আর পি সাহা বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ ক্লাবের যাত্রা শুরু

জার্মানির হফ বিশ্ববিদ্যালয়ে বুটেক্সের তিন শিক্ষার্থীর থিসিস করার সুযোগ

আনন্দ আয়োজন ও স্মৃতিময় সন্ধ্যা

বেরোবির তিন শিক্ষার্থী বানাচ্ছেন বেদে ডকুমেন্টারি

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেন ঢাবির সেই ভিপি প্রার্থী

প্রথম হয়েও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছিল না মুনায়েম, পাশে দাঁড়াল ছাত্রদল

জাবিতে পোষ্য কোটা পুনর্বহালের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি

জবিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের ভর্তি শুরু হবে ২৬ ফেব্রুয়ারি

আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করলেন ঢাবি উপাচার্য

ধারাবাহিক অনুশীলনে গড়ে ওঠে গবেষণার শক্ত ভিত: ড. মোহাম্মদ সাগর হোসেন