পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালে স্কুল থেকে ফেরার পথে বিদ্যুতায়িত হয়ে দুই হাত হারিয়েছিল রফিকুল ইসলাম রাব্বি। সেই থেকে দরিদ্র পরিবারের এই ছেলেটির জীবন সংগ্রামে যুক্ত হয় নতুন মাত্রা। দুর্ঘটনায় দুই হাত হারানোর পর প্রথমে মুখ দিয়ে এবং পরে পা দিয়ে লেখার কৌশল আয়ত্ত করে রাব্বি। পা দিয়ে লিখেই ২০২৪ সালে ভাটিয়ারীর হাজী তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছিল সে। অদম্য মনোবল আর প্রবল ইচ্ছাশক্তির কারণে এবার এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ পেল সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের বজলুর রহমানের ছেলে রাব্বি।
রাব্বি চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছ। এ সাফল্যে যারপরনাই খুশি রাব্বির বাবা-মা ও শিক্ষকেরা। কঠোর অধ্যবসায় আর ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলা রাব্বি যে এখন অনেকেরই অনুপ্রেরণা!
২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাটিয়ারী ফুটওভার ব্রিজের ওপর একটি বৈদ্যুতিক তারে আটকে পড়ে রাব্বি। এতে বিদ্যুতায়িত হয়ে দুই হাতে রক্তক্ষরণের পাশাপাশি গুরুতর আহত হয় সে। দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলেও চিকিৎসকেরা তার দুই হাত কেটে ফেলেন।
পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি অনেকেই ভেবেছিলেন রাব্বির পড়াশুনা এখানেই থেমে যাবে। কিন্তু ছোট্ট রাব্বি লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ কর। শুরুতেই মুখ দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করে রাব্বি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মুখ দিয়ে লিখেই পড়াশোনা চালিয়ে যায়। পরে দ্রুত লেখার জন্য পা দিয়ে লেখার কৌশল আয়ত্ত করে। এরপর থেকে পা দিয়েই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে রাব্বি।
আলাপকালে রাব্বি জানায়, বিদ্যুতায়িত হয়ে দুই হাত হারানোর পর প্রথমে কিছুটা মুষড়ে পড়েছিল সে। পরে তার মা-বাবা, শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষের অনুপ্রেরণায় লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে সে। সবার সহযোগিতা ও নিজের প্রচেষ্টায় এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে সে।
‘ভবিষ্যতে বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখি। এ জন্য বিজ্ঞান বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে চাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে,’ জানায় রাব্বি।
রাব্বির বাবা বজলুর রহমান বলেন, ‘অভাব-অনটনের সংসার। স্বামী-স্ত্রী দুজনই দিন মজুরির কাজ করে সংসার চালাই। ছেলের দুর্ঘটনার পর তার চিকিৎসা ও পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সহযোগিতা করেছে। আইসিডিডিআরবির গবেষক ও চিকিৎসক ফেরদৌসী কাদরী রাব্বির পড়াশোনার খরচ বহন করে আসছেন। ওসমান নামের একজন শিক্ষক তাঁকে বিনামূল্যে কোচিং করিয়েছেন। অনেকের সহযোগিতায় আজকে ছেলের এ অর্জন।’
ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আনোয়ার বলেন, অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর দৃঢ় মনোবল থাকলে যেকোনো পরিস্থিতিতে মানুষ জয় লাভ করতে পারে তার উজ্জ্বল উদাহরণ রাব্বি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ইচ্ছাশক্তির জোরে রাব্বি যে সফলতা অর্জন করেছে তা সমাজের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।