মুশফিকুর রহমান রাতুলের বেড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকায়। মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের লাফায়েত কলেজে স্নাতক পড়ার জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকা সমমানের বৃত্তি বা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। তিনি পড়বেন ব্যাচেলর অব সায়েন্স নিয়ে। নিজের সফলতার গল্প শুনিয়েছেন তিনি। অনুলিখন করেছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম।
ঢাকা শহরের ইটপাথরের জীবনে বড় হওয়ায় গ্রামীণ পরিবেশ উপভোগ করা হয়নি। শৈশবের সোনালি সময় কেটেছে ক্রিকেটের সঙ্গে। বয়সে বড়দের সঙ্গে মাঠে নেমে খেলতাম। তখন থেকে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন মনে উঁকি দিত। পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিও আকর্ষণ ছিল। পরে বিএনসিসিতেও যুক্ত হই। পরিবারের তিন ভাই-বোনের মধ্যে আমি ছোট। বাবা ব্যবসায়ী এবং মা গৃহিণী। বড় বোন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত, আর বড় ভাই যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন।
শৈশব থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলাম। এ কারণে স্কুল ও কলেজে বেশ পরিচিতিও পেয়েছি। ফুটবল, ক্রিকেট ও হ্যান্ডবল—তিনটি খেলাতেই নিয়মিত অংশ নিয়েছি। বর্তমানে স্কুল হ্যান্ডবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। বিএনসিসিতে ক্যাডেট করপোরাল হিসেবে দায়িত্ব ছিল। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অনেক পুরস্কার পেয়েছি। পাশাপাশি ঢাকা কলেজ ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলাদেশ ইকোনমিক অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছি।
ঢাকা কলেজে ভর্তির পরই আমার বড় ভাই রাকিবুল হাসান সাফি স্নাতক পড়তে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। তাঁকে দেখে আমিও অনুপ্রাণিত হই এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য স্থির করি। তখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার প্রস্তুতি শুরু। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিইনি। নিজের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছিলাম, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করব শুধুই যুক্তরাষ্ট্রে।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার প্রক্রিয়া শুরু করি ‘ফল-২৫’ সেশন ঘিরে। বড় ভাইয়ের দিকনির্দেশনায় প্রস্তুতি নিই। প্রথমবার আবেদনেই কয়েকটি অফার লেটার পাই। তবে পূর্ণ টিউশন স্কলারশিপ থাকলেও লিভিং কস্টের কারণে সেই বছর ভর্তি নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ‘ফল সেশন’ ড্রপ দিতে হয়। সে সময় আমার বেশ কিছু বন্ধু বৃত্তির জন্য আবেদন করেছিল। তাদের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। আমি পুনরায় প্রস্তুতি শুরু করি। একই সময়ে এইচএসসি পরীক্ষাও দিতে হয়েছে। সেই কঠিন সময়ে পরিবার ও বন্ধুদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাই। রাত জেগে কলেজের ইনফরমেশন সেশনে অংশ নিই। পরে সিদ্ধান্ত নিই লাফায়েত কলেজে ‘আর্লি ডিসিশন’ আবেদন করব। প্রথম ধাপে প্রতিষ্ঠানটি আমাকে নির্বাচন না করে ‘ডিফার’ করে দেয়। পরে অন্য কলেজ থেকে অফার এলেও আর্থিক ঘাটতি থেকে যায়। এরপর অনিশ্চয়তার মধ্যেও লাফায়েত কলেজে দুটি ইন্টারভিউ দিই। এটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির হার মাত্র ৭ শতাংশ হওয়ায় প্রতিযোগিতা ছিল অত্যন্ত কঠিন। অবশেষে ১৯ মার্চ, রোজার ঈদের দুই দিন আগে স্বপ্নের লাফায়েত কলেজ থেকে অফার লেটার পাই। এটি আমার জন্য বড় অর্জন ছিল। এরপর শুরু হয় ভিসা প্রক্রিয়া, যা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সেই ইউএস ভিসা হাতে পাই।
যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার আবেদনপ্রক্রিয়ায় ভিন্নতা রয়েছে। এটি মূলত ‘হোলিস্টিক অ্যাডমিশন’ পদ্ধতি অনুসরণ করে। এখানে শুধু শিক্ষার্থীর ফল নয়, বরং পুরো প্রোফাইল মূল্যায়ন করে বৃত্তি দিয়ে থাকে। প্রোফাইলের মধ্যে একাডেমিক ফল, সহশিক্ষা কার্যক্রম, নেতৃত্বগুণ এবং রচনাশৈলী অন্তর্ভুক্ত। সাধারণত ‘কমন অ্যাপ’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। সেখানে একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটি, ‘অ্যাচিভমেন্ট’ এবং ‘কমন অ্যাপ এসে’ জমা দিতে হয়। পাশাপাশি ‘লেটার অব রিকমেন্ডেশন’ এবং ইংরেজি দক্ষতার সনদ প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্যাট পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আবেদনের জন্য নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির সব ট্রান্সক্রিপ্ট, এসএসসি ও এইচএসসির মূল সনদ ও নম্বরপত্র, হাইস্কুল প্রোফাইল, শিক্ষকদের সুপারিশপত্র, ইংরেজি দক্ষতার স্কোর ও স্যাট স্কোর প্রয়োজন হয়। আর্থিক সহায়তার জন্য স্পনসরের ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও আয়সংক্রান্ত নথিপত্র জমা দিতে হয়। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী রেজুমে বা পোর্টফোলিও দরকার হয়। ভিসা প্রক্রিয়ার সময় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ১–২০ নম্বর ফর্ম ও সেভিস ফির কাগজপত্রের প্রয়োজন পড়ে।
বৃত্তিতে প্রাপ্ত ফিন্যান্সিয়াল এইড প্যাকেজের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৩২ হাজার মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি টাকা। এই বৃত্তি শিক্ষার সম্পূর্ণ খরচসহ আবাসন ও খাবার খরচের বড় অংশ বহন করবে। শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হবে না, পাশাপাশি ক্যাম্পাসে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা পার্টটাইম কাজের সুযোগ রয়েছে, যা ব্যক্তিগত খরচ চালাতে সহায়তা করবে। স্নাতক শেষে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রে এক থেকে তিন বছরের অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (ওপিটি) বা ওয়ার্ক পারমিটের সুবিধা পাবেন। এর মাধ্যমে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মক্ষেত্রে ক্যারিয়ার শুরু করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা মেধা ও পরিশ্রমকে গুরুত্ব দেয়। তবে সফল হতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা ও প্রস্তুতি। নবম-দশম শ্রেণি থেকে প্রোফাইল গঠনের কাজ শুরু করা উচিত। মনে রাখবেন, যতটুকু পরিশ্রম করবেন, ঠিক ততটুকুই ফল পাবেন। পথটা অবশ্যই কঠিন ও দীর্ঘ। তবে একটি গোছানো পরিকল্পনা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কঠিন পথও সহজ হয়ে ওঠে।