সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একজন আলবার্ট আইনস্টাইন। তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্ব আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি বদলে দিয়েছে। তাঁর চিন্তাভাবনা ও উক্তিগুলো আজ বিশ্বজুড়ে সমানভাবে আলোচিত। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি—‘কল্পনা জ্ঞানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।’
জ্ঞান শুধু আমরা যা জানি এবং বুঝি তাতেই সীমাবদ্ধ, অন্যদিকে কল্পনা সমগ্র বিশ্বের যা যা বোঝা এবং জানা দরকার, তাকেও আবর্তন করে। এই উক্তি আমাদের শেখায়, তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব নয়। প্রকৃত অগ্রগতি হয় নতুন কিছু কল্পনার মাধ্যমে।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের শেখানো হয়, জ্ঞানই শক্তি। পরীক্ষায় ভালো ফল, পুরস্কার, ক্যারিয়ার—সবকিছুই জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে। অথচ প্রতিটি নতুন আবিষ্কারের পেছনে একটি সাহসী কল্পনা বা ধারণা থাকে। প্রমাণের আগে সম্ভাবনা, উদ্ভাবনের আগে ধারণা। জ্ঞান আমাদের সমৃদ্ধ করে, কিন্তু কল্পনা রূপান্তরিত করে।
মুখস্থ করা জ্ঞান পৃথিবী বদলায় না; পৃথিবী বদলায় তখনই, যখন কেউ ভিন্নভাবে ভাবার সাহস করে। ভবিষ্যৎ শুধু তাদের জন্য নয়, যারা তথ্য আয়ত্ত করে; বরং তাদের জন্য, যারা কল্পনা করতে পারে এবং সেই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রস্তুত।
আইনস্টাইন সম্পর্কে
আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন জার্মান-বংশোদ্ভূত এক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী। আধুনিক বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর অবদান অনন্য। আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব এবং ভর ও শক্তির সমতুল্যতা সূত্র (E = mc²)-এর জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। আলোর কণাগত ধর্ম ব্যাখ্যা করে ফটোইলেকট্রিক প্রভাবের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য ১৯২১ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এই গবেষণা কোয়ান্টাম তত্ত্বের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আইনস্টাইনের গবেষণার পরিধি বিস্তৃত; ব্রাউনীয় গতি, এক-আণবিক গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্ব, নিম্ন বিকিরণ ঘনত্বে আলোর তাপীয় ধর্ম, এমনকি আকাশ কেন নীল দেখায়—এ নিয়েও তিনি গবেষণা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ‘ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু, আর বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ।’
উক্তিটি বুঝে নিন
আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন, ‘কল্পনা জ্ঞানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’, এর মানে তিনি জ্ঞানকে ছোট করেননি। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, জ্ঞান সীমিত, কিন্তু কল্পনা সীমাহীন। এই কল্পনাই মানুষকে সাহসী ধারণার দিকে ধাবিত করে। চাঁদে মানুষ হাঁটবে, হাতে হাতে স্মার্টফোন আসবে—এসব একসময় কল্পনাই ছিল। আইনস্টাইন নিজেও কল্পনা করেছিলেন, যদি আলোর রশ্মির সঙ্গে ভেসে চলা যায়, তবে কী দেখা যাবে? এই ভাবনাই পরে তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্বকে প্রভাবিত করেন। কল্পনা সীমা ভেঙে দেয়, জ্ঞান সেই পথ অনুসরণ করে।
কৌতূহল ও সৃজনশীলতায় মন
আইনস্টাইনের দৃষ্টিতে বিজ্ঞান শুধু সূত্র মুখস্থ করা নয়; বরং ভিন্নভাবে চিন্তা করার প্রক্রিয়া। তিনি সময় ও স্থানের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, কারণ তিনি এমন সম্ভাবনা কল্পনা করতে সাহসী ছিলেন, যা অন্যরা তখনো ভাবেননি। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমার বিশেষ কোনো প্রতিভা নেই, আমি শুধু গভীরভাবে কৌতূহলী।’ এই কৌতূহলই তাঁর কল্পনাকে জ্বালানি জুগিয়েছে। তিনি বুঝতেন, উদ্ভাবন শুরু হয় মন থেকে। প্রতিটি আবিষ্কার, তত্ত্ব এবং মানব ইতিহাসের অগ্রগতি প্রথমে একটি ধারণার মধ্যে বিদ্যমান থাকে। আইনস্টাইনের জন্য কল্পনা বুদ্ধিমত্তার থেকে আলাদা নয়; এটি অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি।
আইনস্টাইনের আরও কিছু অনুপ্রেরণামূলক উক্তি
‘জীবন বাইসাইকেলের মতো, ভারসাম্য রাখতে চাইলে তা চালিয়ে যেতে হবে’, ‘সফল মানুষ নয়, মূল্যবান মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো’, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রশ্ন করা, বন্ধ করা নয়’, ‘কঠিন সময়ের মাঝেই লুকিয়ে থাকে সুযোগ’ এবং ‘যুক্তি তোমাকে A থেকে B পর্যন্ত নিয়ে যাবে, কল্পনা তোমাকে সর্বত্র পৌঁছে দেবে।’
তথ্য বা জ্ঞান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু জ্ঞান দিয়ে পৃথিবী বদলানো যায় না। জ্ঞান বলে, কী আছে। কল্পনা দেখায়, কী হতে পারে। সত্যিকারের অগ্রগতি শুরু হয় মন থেকে, সাহসী ধারণা থেকে। আর সেই সাহসী কল্পনাই মানুষকে এগিয়ে নেয় নতুন দিগন্তের দিকে।