বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আজকের পত্রিকার শিক্ষা ও ক্যারিয়ার বিভাগের ইনচার্জ আব্দুর রাজ্জাক খান।
মামুন আহমেদ: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে আমরা মোটামুটি জানি। দেশে এখন প্রায় ১৮০টি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। এগুলোর মধ্যে বেসরকারি প্রায় ১১৭টি, পাবলিক ৬১টি, বাকি ২টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। গত ২০-৩০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থী—দুটোর সংখ্যাই অনেক বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, উচ্চশিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সমাজের আগ্রহ আছে। তবে মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। সমাজে একটি ধারণা আছে, সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
কিছু চ্যালেঞ্জও আছে, যেমন: চার-পাঁচ বছর পড়াশোনা করে বের হয়ে শিক্ষার্থীরা কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে নিজেদের শিক্ষার খুব একটা সম্পর্ক খুঁজে পান না। উদ্যোক্তা হতে চাইলেও শিক্ষার সঙ্গে উদ্যোগের যোগসূত্র মেলে না। ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একাডেমিয়ার সম্পর্কও সেভাবে গড়ে ওঠেনি। তাই এখন আমাদের বড় কাজ মান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্র ও জীবনের সংযোগ তৈরি করা।
দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা একটি জাতীয় কর্মশালা করেছি। সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নীতিনির্ধারক, ইন্ডাস্ট্রি ও সুশীল সমাজের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য উচ্চশিক্ষা রূপান্তরের একটি কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়েছি, যা শিগগির বাস্তবায়িত হবে। এর মূল স্তম্ভ হলো শিক্ষার মান বাড়ানো, ইন্টার্নশিপসহ কর্মমুখী কর্মসূচি চালু, উদ্যোক্তাদের সুযোগ তৈরি এবং সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী তৃতীয় ভাষা চালু করা। নৈতিক শিক্ষা, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সফট স্কিলও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মামুন আহমেদ: ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ জ্ঞান উৎপাদন, বিতরণ ও সংরক্ষণ করা। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, শিক্ষার্থী অর্জিত জ্ঞান দিয়ে কতটা দক্ষতা অর্জন করল এবং সেই দক্ষতা দেশের উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে কতটা অবদান রাখল, সেটি বিবেচনায় আনা। গুণগত শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা উন্নয়ন—সবকিছু একসঙ্গে নিয়ে আমরা শিক্ষার প্রয়োজনীয় রূপান্তর নিশ্চিত করতে চাই।
মামুন আহমেদ: একদিক থেকে সফল। ৩০ বছর আগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৬-৭টি, এখন ৬১টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। অর্থাৎ আগে যাঁরা বিদেশে পড়তে যেতেন, তাঁদের অনেকে এখন দেশে পড়ছেন। তবে মানসম্মত শিক্ষার জন্য কিছু শিক্ষার্থী এখনো বিদেশে যান, এতে সন্দেহ নেই। দেশেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে এই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে। সরকার ও ইউজিসি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে আমরা একটি এডুকেশন হাব গড়তে চাই, যেখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বিদেশি শিক্ষার্থীরাও পড়ার সুযোগ পাবেন।
মামুন আহমেদ: এটি খুবই আশাব্যঞ্জক। মাত্র ২৫-৩০ বছরে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই সাফল্য দেখিয়েছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, এআইইউবিসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে আছে। আমি তাদের অভিনন্দন জানাই। এই ধারা অব্যাহত রাখা দরকার।
মামুন আহমেদ: যারা ভালো করছে, তাদের থেমে থাকলে চলবে না। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য উন্নত গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সবাই গবেষণায় যুক্ত হতে পারেন। তাহলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে তারা আরও ভালো করবে। যাদের সীমাবদ্ধতা আছে, আমরা চাই তারা সেগুলো কাটিয়ে র্যাঙ্কিংয়ে ভালো করার চেষ্টা করুক।
মামুন আহমেদ: গবেষণায় ইউজিসি সব বিশ্ববিদ্যালয়কে উৎসাহিত করে, পাবলিক বা প্রাইভেট, কোনো পার্থক্য করা হয় না। আমাদের গবেষণা অর্থায়ন প্রতিযোগিতামূলক। যারা মানসম্মত গবেষণা প্রস্তাব দেবে, যথাযথ যাচাইয়ের পর তারাই অনুদান পাবে। স্বর্ণপদক ও ইউজিসি অ্যাওয়ার্ডের মতো পুরস্কারের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়।
মামুন আহমেদ: এটি সত্যিই আমাদের উচ্চশিক্ষার বড় সংকটগুলোর একটি। সমাধান হলো কোর্স কারিকুলাম ও সিলেবাস আপগ্রেড করা এবং সেটি চাকরির বাজারের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথভাবে করা। তাহলে কিছুটা উন্নতি সম্ভব। তবে শুধু চাকরির বাজারের জন্য গ্র্যাজুয়েট তৈরিই বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র লক্ষ্য নয়। জ্ঞান অর্জন, গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি ও সংরক্ষণ এবং বাজারের জন্য দক্ষ করে তোলা—সব মিলিয়ে আধুনিক শিক্ষার প্রয়োজন। পাবলিক-প্রাইভেটনির্বিশেষে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা সেভাবেই গড়ে তুলছি।
মামুন আহমেদ: আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশই সিলেবাস ও কারিকুলামের আধুনিকায়ন। শিক্ষার্থীকে জ্ঞান অর্জন করতে হবে, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করতে হবে এবং আধুনিক দক্ষতা নিয়ে বের হতে হবে, যাতে দেশে-বিদেশে কাজ পায়। এর অংশ হিসেবে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখার ব্যবস্থা করছি। এ জন্য ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প নিয়েছি, যেগুলো শিগগির উদ্বোধন করব। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্লেসমেন্ট সেন্টার, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, ইনোভেশন সেন্টার ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার গড়ে দিতে চাই, যাতে শিক্ষার্থীরা অর্জিত দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ পান এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একাডেমিয়ার সংযোগের জন্য ইন্টার্নশিপ চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এখন কৃষি ও মেডিকেল গ্র্যাজুয়েটরা ইন্টার্নশিপের আওতায় আছেন। আগামী পাঁচ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের এর আওতায় আনার পরিকল্পনা আছে।
মামুন আহমেদ: এআই একটি বাস্তবতা। আমরা এর ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করতে এবং নেতিবাচক দিক বর্জন করতে চাই। একাডেমিক চর্চায় এর ভালো দিকগুলো কীভাবে রাখা যায়, সে জন্য ইউজিসির পক্ষ থেকে একটি এআই পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছি। সেটি অনুসরণ করে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের এআই নীতিমালা করবে এবং কোথায় এআই ব্যবহার করা যাবে আর কোথায় যাবে না, তা সুনির্দিষ্ট করবে। আমরা এআইকে বাস্তবতা ও সুযোগ হিসেবেই দেখতে চাই।
মামুন আহমেদ: এটি বাস্তবতা যে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষকের স্বল্পতা আছে। চাইলেই আজ ডেকে কাল মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়া যায় না; এ জন্য সময় লাগবে। আমরা শিক্ষকদের জন্য পিএইচডি, পোস্টডক ও মাস্টার্স প্রোগ্রাম বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছি। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে তাঁরা যেন ভালো করতে পারেন, সে জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আওতায় আনছি।
মামুন আহমেদ: পাবলিক-প্রাইভেটনির্বিশেষে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করবে—এটাই আমরা দেখতে চাই। সেই শিক্ষা হবে কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং আন্তর্জাতিক মানের। গ্র্যাজুয়েটরা মানসম্পন্ন শিক্ষা, উচ্চ নৈতিকতা ও মূল্যবোধ নিয়ে বের হবেন—এমন পরিবেশ ও এমন বিশ্ববিদ্যালয়ই আমরা নিশ্চিত করতে চাই।