বিসিএস ভাইভা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বই নির্বাচন ও সঠিকভাবে পড়াশোনার কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আসন্ন ৪৭তম বিসিএস ভাইভা পরীক্ষায় অংশ নিতে যাওয়া প্রার্থীদের জন্য অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত এবং ৪৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে (মেধাক্রম-৭) সুপারিশপ্রপ্ত ডা. আফিয়া তাসনীম।
বিসিএস ভাইভার প্রস্তুতিতে বই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কীভাবে সে বইগুলো পড়া হচ্ছে। অনেক প্রার্থী একাধিক বই একসঙ্গে পড়তে গিয়ে বিভ্রান্ত হন, আবার কেউ কেউ শুধু গাইডনির্ভর হয়ে পড়াশোনা করেন। বাস্তবে কার্যকর প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও কৌশলভিত্তিক পদ্ধতি।
সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় ও বিশ্লেষণ
ভাইভা প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ হলো নিয়মিত মানসম্মত পত্রিকার সম্পাদকীয় ও বিশ্লেষণধর্মী কলাম পড়া। এটি শুধু তথ্য সরবরাহ করে না, বরং কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সক্ষমতা তৈরি করে। ভাইভায় অনেক প্রশ্নই মতামতনির্ভর হয়। সেখানে একটি বিষয়কে কীভাবে যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করতে হয় এবং পক্ষে-বিপক্ষে ভারসাম্যপূর্ণ যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়—এই দক্ষতা গড়ে ওঠে নিয়মিত এই চর্চার মাধ্যমে। একজন হবু ক্যাডার কর্মকর্তার জন্য প্রয়োজনীয় মার্জিত ও বিশ্লেষণধর্মী বাচনভঙ্গি অর্জনেও এটি সহায়ক।
রেফারেন্স বই ও নির্ভরযোগ্য উৎস
তথ্যের নির্ভুলতা যাচাইয়ের জন্য রেফারেন্স বইয়ের বিকল্প নেই। সংবিধান, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে মানসম্মত মূল বই, সরকারি প্রতিবেদন, অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও পরিকল্পনা কমিশনের ডকুমেন্ট ব্যবহার করলে উত্তরের মান বৃদ্ধি পায়। এতে সঠিক তথ্যের পাশাপাশি বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অফিশিয়াল ওয়েবসাইট
নিজের পছন্দের ক্যাডার এবং বর্তমান সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে হালনাগাদ ও নির্ভুল তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট নিয়মিত দেখা জরুরি। বিশেষ করে প্রথম পছন্দের ক্যাডারের কাজ, ভিশন, মিশন এবং সাম্প্রতিক অর্জনগুলো নোট করা উচিত। পাশাপাশি সরকারি পোর্টাল থেকে বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, উন্নয়ন কর্মসূচি ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ধারণা নেওয়া উত্তরের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
গাইডবইয়ের পরিমিত ব্যবহার
গাইডবই সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ভাইভায় কী ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে, সে সম্পর্কে কাঠামোগত ধারণা গাইডবই থেকেই পাওয়া যায়। বিভিন্ন ক্যাডারভিত্তিক প্রশ্ন ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার সংকলন এতে সহায়ক। তবে গাইডবইকে মূল উৎস নয়; বরং প্রশ্ন সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে এসব বইয়ের উত্তর সংক্ষিপ্ত বা অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে।
একাডেমিক পাঠ
নিজের একাডেমিক বিষয়ের বই নতুন করে গভীরভাবে পড়ার চেয়ে মৌলিক ধারণাগুলো আবার ঝালিয়ে নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সংজ্ঞা, মূল তত্ত্ব এবং তার বাস্তব প্রয়োগ—এই তিনটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ ভাইভায় অনেক সময় তাত্ত্বিক প্রশ্নের পাশাপাশি বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়।
ক্যাডারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতামূলক বই
নিজের প্রথম পছন্দের ক্যাডার সম্পর্কে গভীর ধারণা পেতে সংশ্লিষ্ট ক্যাডার কর্মকর্তাদের লেখা অভিজ্ঞতামূলক বই পড়া অত্যন্ত উপকারী। ভাইভা বোর্ডে প্রায়ই জানতে চাওয়া হয়, প্রার্থী তাঁর পছন্দের ক্যাডার সম্পর্কে কোনো অভিজ্ঞতামূলক বই পড়েছেন কি না। যেমন পররাষ্ট্র ক্যাডার প্রথম পছন্দ হলে ফারুক চৌধুরীর ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ ধরনের বই সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে, বই পড়ার ক্ষেত্রে ‘কম কিন্তু কার্যকর’ নীতি অনুসরণ করা উচিত। একাধিক বই পড়ে বিভ্রান্ত হওয়ার চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু উৎস বারবার পড়ে নিজের মতো করে নোট তৈরি করাই বেশি ফলপ্রসূ। কারণ ভাইভায় মুখস্থ জ্ঞান নয়; বরং নিজের ভাষায় স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করার সক্ষমতাই মূল বিবেচ্য বিষয়।
অনুলিখন: জেলি খাতুন