বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর পর অনেক শিক্ষার্থীর ইচ্ছা থাকে নিজ ক্যাম্পাসে ফেরার কিংবা অন্য কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার। ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে পাঠদান, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার সুযোগ শিক্ষকতা পেশাকে একই সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ ও অর্থবহ করে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার প্রস্তুতি ও বাস্তবতা নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক মারসিয়া তাবাসসুম রিমশা।
অনেকের ধারণা, করপোরেট জীবনের ব্যস্ততার তুলনায় একাডেমিক জীবন অনেক বেশি গোছানো এবং এখানে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সুন্দর ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার কাজ শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশেষ করে ক্যারিয়ারের শুরুতে একজন শিক্ষককে নতুন করে কোর্সের বিষয়বস্তু আয়ত্ত করতে হয়, পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করতে হয় এবং শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়গুলো সহজভাবে উপস্থাপনের উপায় খুঁজতে হয়। এর পাশাপাশি স্লাইড প্রস্তুত করা, কোর্স আউটলাইন তৈরি, প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র প্রণয়ন, অ্যাসাইনমেন্ট ও কেস স্টাডি তৈরি এবং খাতা মূল্যায়নের মতো দায়িত্বও থাকে। ফলে শুরুর দিকে ব্যক্তিগত সময়ের বড় একটি অংশই পেশাগত প্রস্তুতিতে ব্যয় করতে হয়। তবে সময়ের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বাড়লে কাজের চাপ তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে আসে। একাডেমিয়ায় সফল হতে হলে আজীবন শেখার মানসিকতা থাকা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার প্রস্তুতি স্নাতক শেষ হওয়ার পর নয়, শুরু হওয়া উচিত ছাত্রজীবন থেকেই।
একটি প্রচলিত ধারণা হলো, যিনি সবচেয়ে ভালো ফল করেন, তিনিই সবচেয়ে ভালো শিক্ষক হবেন। বাস্তবে বিষয়টি সব সময় সত্য নয়। একজন শিক্ষককে শুধু বিষয়বস্তু জানলেই চলে না, সেটি সহজভাবে অন্যকে বোঝানোর সক্ষমতাও থাকতে হয়। এই দক্ষতাকে বলা হয় ‘ইনস্ট্রাকশনাল স্কিল’। ছাত্রজীবন থেকে সহপাঠীদের কোনো বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া, দলগত আলোচনায় অংশ নেওয়া, উপস্থাপনা করা এবং নিয়মিত নোট তৈরির অভ্যাস ভবিষ্যতের শিক্ষকতার জন্য কার্যকর প্রস্তুতি হতে পারে। একজন দক্ষ শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মুখভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝতে পারেন, কে বিষয়টি বুঝেছে আর কে বুঝতে পারেনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।
সিভি বাছাই: প্রথমে একাডেমিক ফল, সিজিপিএ এবং অন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে আবেদনকারীদের প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়।
লিখিত পরীক্ষা: লিখিত পরীক্ষায় সাধারণত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান যাচাই করা হয়। এতে তাত্ত্বিক প্রশ্ন, গাণিতিক সমস্যা, বহুনির্বাচনি প্রশ্ন কিংবা ব্যক্তিত্ব মূল্যায়নের কিছু প্রশ্নও থাকতে পারে।
ডেমো ক্লাস বা প্রেজেন্টেশন: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রার্থীদের একটি পরীক্ষামূলক ক্লাস নিতে হয়। কখনো তাৎক্ষণিকভাবে একটি বিষয় দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে বলা হয়, আবার কখনো আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে বলা হয়। এ পর্যায়ে প্রার্থীর উপস্থাপনা দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়।
� চূড়ান্ত সাক্ষাৎকার: সবশেষে ভাইভা বোর্ডে অংশ নিতে হয়।
করপোরেট বা শিল্পক্ষেত্রে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে শিক্ষকতায় আসাও সম্ভব। বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলে শ্রেণিকক্ষে তত্ত্বের পাশাপাশি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা সহজ হয়, যা শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে। তবে একাডেমিয়ায় প্রবেশের জন্য লিখিত পরীক্ষা ও ডেমো ক্লাসের প্রস্তুতি আলাদাভাবে নিতে হয়। ফলে ক্ষেত্র পরিবর্তনের আগে যথেষ্ট প্রস্তুতি প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের স্লাইড, নোট, অ্যাসাইনমেন্ট, কেস স্টাডি ও পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ করে রাখা ভালো।
পরে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় এসব উপকরণ দ্রুত রিভিশনে সহায়তা করবে।যাঁরা শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের শুরু থেকে লক্ষ্য স্থির রাখা উচিত। পড়াশোনাকে শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, শেখার আনন্দ থেকে গ্রহণ করতে হবে। কারণ, একাডেমিয়ায় সফল হওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো নিরন্তর শেখার আগ্রহ। শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি শেখা, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলার দীর্ঘ যাত্রা। আর সে কারণেই একাডেমিয়া এখনো অনেক তরুণের স্বপ্নের কর্মক্ষেত্র।
গ্রন্থনা: মুসাররাত আবির