দেশে সস্তা প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস ডিম ও ব্রয়লার মুরগি। তবে বাড়তি উৎপাদন খরচ, করের চাপ এবং খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে পোলট্রিশিল্প এখন গভীর সংকটে পড়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তা—বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ডিম ও মুরগির দাম ভবিষ্যতে দ্বিগুণে পৌঁছাতে পারে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।
খামারি ও উদ্যোক্তাদের প্রধান দাবি, ডিম-মুরগির দাম সহনীয় রাখতে হলে পোলট্রি খাতে বিদ্যমান কর ও শুল্ক কমাতে হবে। বিশেষ করে ১ শতাংশ টার্নওভার কর প্রত্যাহার, করপোরেট কর উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কমিয়ে আনার দাবি জোরালোভাবে তুলছেন তাঁরা।
তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পোলট্রি খাতে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাপ এসেছে খাদ্যে, যা মোট ব্যয়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে করপোরেট কর ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৭.৫ শতাংশ, এআইটি ১ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ এবং টার্নওভার কর ০.৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় খামারিদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে একটি ডিম উৎপাদনে খরচ পড়ছে প্রায় ১০.৫ থেকে ১১ টাকা, অথচ পাইকারিতে অনেক সময় তা বিক্রি করতে হচ্ছে ৭.৫ থেকে ৮.৫ টাকায়। একইভাবে ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা হলেও বাজারদর প্রায় সমপর্যায়ে থাকায় লাভ তো হচ্ছেই না, অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতে এত বেশি কর নেই। এই বাস্তবতায় খাতটি টিকিয়ে রাখতে করের হার অন্তত অর্ধেকে নামানো প্রয়োজন। না হলে এই খাত বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে, যা বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি তৈরি করবে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকট নিরসনে খাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর কমানো জরুরি। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে পশুখাদ্য উৎপাদন বাড়াতে যন্ত্রপাতি আমদানিতে করছাড় এবং প্রণোদনা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, প্রতিবেশী দেশগুলোতে এ খাতে তুলনামূলকভাবে কম কর আরোপ করা হয়, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ হোসেনের মতে, পোলট্রিশিল্পকে শুধু ব্যবসা নয়, খাদ্য নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে বাজেটে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি মনে করেন, টার্নওভার কর কমিয়ে ০.২ শতাংশে এবং করপোরেট কর ১০ শতাংশে নির্ধারণ করা হলে বিনিয়োগ বাড়বে। একই সঙ্গে এআইটি ১ শতাংশে নামিয়ে এনে ফেরত প্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। তা না হলে ডিম-মুরগি ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. সাফির রহমান বলেন, ‘সরকার যদি বাজেটে বিশেষ সুবিধা না দেয়, তাহলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। বিদ্যমান উদ্যোক্তারাও খাত ছাড়তে বাধ্য হবেন। তখন ডিম-মুরগি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।’