মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও বাজারে স্বস্তি মিলছে না। বরং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির প্রভাবে আবারও বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। মার্চে কিছুটা কমার পর এপ্রিল ও মে—টানা দুই মাস ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে মূল্যস্ফীতি। বিদায়ী মে মাসে জাতীয় পর্যায়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গতকাল রোববার প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিবিএসের হিসাবে, এপ্রিল মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে তা শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে মে মাসে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। এর আগে মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। ওই সময় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাব এখন পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ—সব স্তরেই খরচ বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের দামে।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৯ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। মাত্র এক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশে, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, চাল, ভোজ্যতেল, ডাল, শাকসবজি, মাছ ও মাংসের দাম মে মাসজুড়েই বাড়তির দিকে ছিল। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি ও খুচরা—দুই পর্যায়েই পণ্যমূল্য বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ে। আয় না বাড়লে তাদের সংসার চালানোর খরচ বেড়ে যায়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। ফলে বাজারে শাকসবজি, মাছ-মাংসের দাম বেড়েছে। চালের দামও কেজিতে ২-৩ টাকা বেড়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার হয়েছে ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ হলেও মজুরি বেড়েছে তার চেয়ে কম। এতে প্রকৃত আয় কমে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। অন্যদিকে কৃষি খাতে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, শিল্পে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং সেবা খাতে ৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, মূল্যস্ফীতি যখন মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যায়, তখন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। এতে পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে ব্যয় কমায়, যা শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক ভোগ ব্যয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির বড় অংশই ‘কস্ট-পুশ’ বা ব্যয়-প্রণোদিত। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পরিবহনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সংরক্ষণ ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ায়।
ভর্তুকি কমাতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম বাড়িয়ে ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, বাংলাদেশে বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় কারণ ব্যয় বৃদ্ধি। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পুরো সরবরাহব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এ ধরনের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি।
বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, মে মাসে গ্রামীণ এলাকায় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ, যা শহরের ৯ দশমিক ২৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। গ্রামে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়েছে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হানের মতে, পরিবহন ব্যয় ও কৃষি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি অনুভূত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা করছেন, আগামী মাসগুলোতেও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। কারণ, মে মাসের শেষ দিকে আবারও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও ধীরে ধীরে বাজারে পড়বে। এসব সিদ্ধান্তের পূর্ণ প্রভাব জুন ও জুলাই মাসের মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে।