২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে তামাক ও তামাকজাত পণ্যের ওপর আরোপিত কর ও মূল্য কাঠামো জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং রাজস্ব বৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়। বাজেটে নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য সামান্য বৃদ্ধি এবং বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম ও করহার অপরিবর্তিত রাখার ফলে এসব পণ্যের প্রকৃত মূল্য কমে যাবে, যা তামাক পণ্যের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করবে এবং তরুণ ও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে তামাক ব্যবহার আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আজ বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণা পরবর্তী ঢাকা আহছানিয়া মিশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মাসউদুল হক, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এমএম বাদশাহ এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য সেক্টরের পরিচালক ইকবাল মাসুদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তামাক নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের সমন্বয়কারী শরিফুল ইসলাম।
সংবাদ সম্মেলনে শরিফুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে দেশের সিগারেট বাজারের প্রায় ৭৫ শতাংশ নিম্নস্তরের সিগারেটের দখলে, যার প্রধান ভোক্তা দরিদ্র ও তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রস্তাবিত বাজেটে নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম মাত্র ২ টাকা বাড়িয়ে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মাত্র ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি। অথচ দেশের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির হার এর চেয়ে অনেক বেশি। ফলে নিম্নস্তরের সিগারেটের প্রকৃত মূল্য কমে যাবে এবং এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে, প্রস্তাব অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটকে একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ, প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপ এবং সব ধরনের তামাক পণ্যের দাম বৃদ্ধি করা হলে চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে প্রায় চার লাখ অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, সিগারেটের মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরের দাম কিছুটা বাড়ানো হলেও কর কাঠামোয় কোনো মৌলিক সংস্কার আনা হয়নি। ফলে মূল্যবৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য অংশ তামাক কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত মুনাফায় পরিণত হবে এবং তাঁদের তামাক ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হবে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
প্রস্তাবিত বাজেটে বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম এবং করহার অপরিবর্তিত রাখার ফলে সস্তা ও সহজলভ্য হবে এসব পণ্য ফলে বাড়বে স্বাস্থ্যঝুঁকি, বিশেষ করে নারী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিষিদ্ধকরণের সুপারিশ বিবেচনায় না নিয়ে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর কর আরোপের মাধ্যমে মূলত এসব নতুন পণ্যকে বৈধতা দান করা হয়েছে, যা নতুন ধরনের নিকোটিন আসক্তি বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করবে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে ৩৫ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন এবং তামাক ব্যবহারজনিত রোগে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। তামাক ব্যবহারজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
তামাক ব্যবহারজনিত অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ বর্তমান সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। এ লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২৬ পাশ করেছে। বর্তমান সরকার প্রধান তামাক ও নিকোটিনজাত পণ্যের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখাতে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে তামাক কর ও মূল্য কাঠামোর সংস্কার, সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে মূল্য বৃদ্ধি, সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতি প্রবর্তন, বিড়ি, জর্দা ও গুলের কর ও মূল্য বৃদ্ধি এবং নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোসহ সব ধরনের নিকোটিন পণ্য স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, তরুণ প্রজন্মকে তামাকের আসক্তি থেকে রক্ষা এবং সরকারের বাড়তি রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগানোরও দাবি জানানো হয়।