হোম > অর্থনীতি

ইরান যুদ্ধ: জ্বালানি খাত ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা সরকারের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: এএফপি

ইরান সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে এই আশঙ্কায় দেশের জ্বালানি খাত ও জ্বালানি সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পুনর্গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে তার আগে স্বল্পমেয়াদে ভোক্তা ও ব্যবসার ওপর এই সংকটের প্রভাব কমানোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে এই তথ্য জানিয়েছেন।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘কাঠামোগত পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন—সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, রিফাইনারি সক্ষমতা উন্নত করা, জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা, সিস্টেম লস কমানো এবং দক্ষতা বৃদ্ধি ও জ্বালানি খাতের সংস্কার ত্বরান্বিত করা।’

বাংলাদেশ এখনও আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে ইরান যুদ্ধ থেকে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট দাম হঠাৎ বাড়িয়ে দিতে পারে কিংবা সরবরাহেই প্রভাব ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা বাড়ছে। জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ ইতোমধ্যে রাস্তায় নৈমিত্তিক দৃশ্য হয়ে উঠেছে। ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটে বৈশ্বিক দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে দেশ তীব্র জ্বালানি ঘাটতির মুখে পড়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি কমানো হয়। এতে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয় এবং লোডশেডিং শুরু হয়। বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়, যা শিল্প খাতে—বিশেষ করে পোশাক শিল্পে—বাধা সৃষ্টি করে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম মন্থর করে দেয়। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে উঠে যায়।

এমন দৃশ্যমান চাপের মধ্যেও রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলছেন, পরিস্থিতি গুরুতর হলেও এখনো ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে। তাঁর মতে, তেল–গ্যাসের জন্য এই দীর্ঘ লাইনগুলো শুধু সরবরাহ সংকট নয়, ‘আচরণগত কারণেও’ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সিস্টেমের ওপর চাপ আছে, তবে দেশজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ভেঙে পড়েনি।’

ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের সরকার এপ্রিল মাসের জন্য জ্বালানির দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যদিও বৈশ্বিক তেলের বাজার এখনো অস্থির। তাঁর উপদেষ্টার ভাষ্য অনুসারে, এই সিদ্ধান্ত ‘বৈশ্বিক বাস্তবতা অস্বীকার করা নয়, বরং দেশীয় অর্থনীতিকে ধাক্কার প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেওয়া।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি প্রত্যেকবার দাম পরিবর্তন সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় বাজারে তা প্রতিফলিত করি, তাহলে তা শুধু সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেওয়া হবে না, বরং একইসঙ্গে তা নীতিগত অনিশ্চয়তার বার্তাও দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন বোরো ধানের মৌসুম পুরোদমে চলছে। এটি দেশের সবচেয়ে বড় ফসল চক্র, যা মোট চালের একটি বড় অংশ সরবরাহ করে। উৎপাদনের সময় সামান্য খরচ বাড়লেও কৃষকদের ইতোমধ্যেই সীমিত মুনাফা মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে এবং তারা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।’

বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেশ আগে থেকেই উচ্চ পর্যায়ে। এর মধ্যে বৈশ্বিক দামের ঊর্ধ্বগতি সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেললে পরিবহন ভাড়া, খাদ্যের দাম এবং উৎপাদন খরচ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দাম স্থির রাখার মাধ্যমে সরকার ‘সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার সময় পাচ্ছে’ এবং একই সঙ্গে দ্বিতীয় ধাপের মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এই ব্যবস্থা কোনো ‘ব্ল্যাংক চেক’ নয়। সরকার আমদানি ব্যয়, রাজস্ব প্রভাব এবং সরবরাহ পরিস্থিতি ‘নিরবচ্ছিন্নভাবে’ পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি বাহ্যিক ধাক্কা ভর্তুকি, কৃত্রিম মূল্য নির্ধারণ বা অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যয়ের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যায় না। এর বদলে ব্যয় পুনর্বিন্যাস, দেশীয় রাজস্ব আহরণ জোরদার, বাস্তবসম্মত বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত সরকারি সম্পদের বিচক্ষণ ব্যবহার—এসবের ওপর জোর দিতে হবে।’

জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ এখন শুধু পেট্রোলপাম্পের লাইনে সীমাবদ্ধ নেই, এর প্রভাব আরও গভীরে দৃশ্যমান। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এবং সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিবেদন বলছে, ডিজেল—যা পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের লাইফলাইন—সাম্প্রতিক দিনগুলোতে গড়ে প্রায় দুই সপ্তাহের মজুতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণত দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে ওঠানামা করে। কিন্তু আতঙ্কজনিত কেনাকাটা বা প্যানিক বায়িংয়ের কারণে এই চাহিদা অতিরিক্ত ৩ হাজার টন পর্যন্ত বেড়েছে বলে বিপিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

একই সময়ে ডিজেলের একাধিক চালান—কমপক্ষে পাঁচটি ট্যাংকার, যাতে ১ লাখ ৪০ হাজার টনের বেশি জ্বালানি রয়েছে—এখন খালাসের প্রক্রিয়ায় আছে। এটি স্পষ্ট করে যে, দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা সচল রাখতে আমদানির ধারাবাহিক প্রবাহ কতটা অপরিহার্য। পেট্রোল ও অকটেনের মজুত তুলনামূলক কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো টানটান।

বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রুটে প্রভাব ফেলায়, জ্বালানি সংগ্রহ এখন একদিকে যেমন ব্যয়বহুল হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ফলে সরকার বিকল্প উৎস খোঁজার উদ্যোগ নিচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ‘যেখান থেকেই সরবরাহ আইনগতভাবে বৈধ, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক, প্রযুক্তিগতভাবে উপযোগী এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—সেখান থেকেই আমরা জ্বালানি সংগ্রহ করব।’ তিনি জানান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে যে উৎস-বৈচিত্র্যকরণ কৌশল ছিল, তা এখন জরুরি প্রয়োজন হিসেবে সামনে এসেছে।

বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোর ওপর নির্ভরতার বাইরে যেতে চাইছে বাংলাদেশ। তবে নতুন কোনো উৎস বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে চারটি শর্ত পূরণ করতে হবে বলে তিতুমীর উল্লেখ করেন। সেই চারটি শর্ত হলো—‘দাম, গুণগত মান, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং নিষেধাজ্ঞা বা ব্যাংকিং অনুবর্তিতা।’ রাশিয়া বা মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে সম্ভাব্য আমদানির আলোচনায় এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, সেখানে ভূরাজনৈতিক ও আর্থিক লেনদেনের সীমাবদ্ধতা সরবরাহের সম্ভাবনাকে জটিল করে তোলে।

চাপ শুধু জ্বালানির সরবরাহেই সীমাবদ্ধ নয়। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশের বৈদেশিক আর্থিক পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব পড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে স্বল্প সময়ের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে। যদিও মার্চে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কিছুটা শক্তিশালী ছিল, তবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানের হামলার কারণে বাংলাদেশের অনেক প্রবাসী শ্রমিক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। সেখানে শ্রমবাজারে কোনো বিঘ্ন ঘটলে শ্রমিকদের দেশে ফিরে আসা এবং রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ সচেতন, তবে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি ধরে নিয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না।’ তিনি জানান, কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রবাসী শ্রমিকদের বৈধতা ও আয়ের প্রবাহ সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি, শ্রমিকদের ফিরে আসার সংখ্যা বাড়লে তাদের পুনর্বাসন ও সহায়তার জন্য বিকল্প পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শ্রমিকরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রার উৎস নন, তারা এই দেশের নাগরিক।’

বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ সরকারের সামগ্রিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সবশেষে তিতুমীর বলেন, ‘সংক্ষেপে বললে, আমাদের প্রতিক্রিয়া গড়ে উঠেছে স্থিতিশীলতা, শৃঙ্খলা, বৈদেশিক সহায়তা এবং কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তিতে—যাতে তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করা যায়। চাপ অবশ্যই গুরুতর, তবে বাংলাদেশের হাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা ও নীতিগত সরঞ্জামও রয়েছে।’

তথ্যসূত্র: নিক্কেই এশিয়া

দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটের সংখ্যা বেড়েছে ৩৮ লাখ

ভারতের উচ্চ প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিকে টলিয়ে দিয়েছে ইরান যুদ্ধ

রিজার্ভের অর্থ ঋণে টেনে নিতে চান ব্যবসায়ীরা

এডিপি বাস্তবায়ন মাত্র ৩০%

করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবি ফিকির

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানির অতিনির্ভরতা বড় ঝুঁকি: সংসদে অর্থমন্ত্রী

৫ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন করা হবে: কৃষিমন্ত্রী

শেয়ারবাজারে বন্ড, ইটিএফ, সুকুক ও ডেরিভেটিভ চালুর পরিকল্পনা সরকারের

মোবাইল ফাইন্যান্স ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে প্রতারণা রোধে সরকারের ৭ পদক্ষেপ

সরকারের প্রথম একনেক সভায় ৪৮৩.৪৩ কোটি টাকার পাঁচ প্রকল্প অনুমোদন