বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধমনি পানামা খালকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে। পানামা খালের প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই মহাশক্তির এই দ্বন্দ্বে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে পানামা সরকার। হংকংভিত্তিক কোম্পানি ‘সিকে হাচিসনে’র বন্দর চুক্তি বাতিল এবং চীনে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে চরম উত্তেজনা।
পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন, তাঁর দেশ বর্তমানে দুই পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বিরোধের মধ্যে পড়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা অনেকটা দুই বড় শক্তির লড়াইয়ের মাঝে পড়ে গেছি। তবে আমি চাই না এই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও বাড়ুক এবং আমাদের জাহাজগুলোকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হোক।’
উল্লেখ্য, হংকংয়ের সিকে হাচিসন কোম্পানি প্রায় তিন দশক ধরে পানামার গুরুত্বপূর্ণ বন্দর পরিচালনা করে আসছিল। তবে গত জানুয়ারিতে পানামার সুপ্রিম কোর্টের এক সিদ্ধান্তের পর তাদের চুক্তি বাতিল করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই কৌশলগত জলপথে চীনের প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল চাপের মুখেই পানামা এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। বর্তমানে বন্দরগুলোর দায়িত্ব সাময়িকভাবে ডেনমার্কের ‘মায়েরস্ক’ এবং সুইজারল্যান্ডের ‘এমএসসি’কে দেওয়া হয়েছে।
সিকে হাচিসন এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ দখল’ আখ্যা দিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট মুলিনো আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছেন, ‘আমরা কোনো সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করিনি; যেহেতু তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই সরকার এর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।’
এ ঘটনার পর থেকেই চীনে পানামার পতাকাবাহী জাহাজগুলোর ওপর কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। অস্বাভাবিক হারে পানামার জাহাজ ডিটেনশন বা আটকে রাখার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো এটিকে পানামার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। অন্যদিকে, চীন এই অভিযোগকে ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে এবং ওয়াশিংটনকে বন্দর নিয়ে রাজনীতি না করার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৫ শতাংশ পানামা খালের ওপর দিয়ে পরিচালিত হয়। ফলে এই খালের প্রবেশপথের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের দড়ি টানাটানি চলছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে পানামা সরকারকে জানানো হয়েছে, বন্দর নিয়ে বিরোধটি আন্তর্জাতিক আদালতে নিষ্পত্তি হবে এবং এটি দুই দেশের সরকারি সম্পর্কের কোনো বিষয় নয়। তবে চলমান জাহাজ আটকের ঘটনা বেইজিংয়ের ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ বার্তার সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রেসিডেন্ট মুলিনো জানিয়েছেন, তিনি পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং এখনই পরবর্তী বড় কোনো পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে এমনিতেই বিশ্ব বাণিজ্য অস্থির, তার ওপর পানামা খালের এই সংকট বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স