দেশে এক দশকে অর্থনৈতিক ইউনিট বেড়েছে ৩৮ লাখ ৮৪ হাজার ২২৭টি। ইউনিট বৃদ্ধির হার প্রায় ৫০ শতাংশ। এর শীর্ষে রয়েছে সেবা খাত। তবে ইউনিট বৃদ্ধির তুলনায় কর্মসংস্থান বাড়েনি। দেশের অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও তা মূলত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সেবা খাতনির্ভর।
দেশের অর্থনীতির বিস্তার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের এই চিত্র উঠে এসেছে অর্থনৈতিক শুমারি, ২০২৪-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অডিটরিয়ামে গতকাল মঙ্গলবার ‘অর্থনৈতিক শুমারি, ২০২৪-এর ন্যাশনাল রিপোর্ট প্রকাশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। বিবিএস ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এই শুমারির কাজ করেছে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে শুমারির প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্ব হয়েছে। এটি চতুর্থ অর্থনৈতিক শুমারি। প্রথম শুমারি প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে।
পরিকল্পনাবিদদের মতে, এই প্রবণতা ধরে রাখতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই), উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী নীতির ওপর আরও জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
অর্থনৈতিক ইউনিট বলতে পণ্য উৎপাদন বা সেবা দেওয়ার মাধ্যমে আয়সংশ্লিষ্ট যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়িক সত্তাকে বোঝায়। অর্থনৈতিক ইউনিট হতে পারে–একজন ব্যক্তি (যেমন ফ্রিল্যান্সার, দর্জি), একটি দোকান বা ব্যবসা, একটি কোম্পানি বা কারখানা, যেকোনো প্রতিষ্ঠান, যেখানে পণ্য তৈরি হয় বা সেবা দেওয়া হয় এবং এর মাধ্যমে আয় হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে মোট অর্থনৈতিক ইউনিট দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ১৭ লাখ ২ হাজার ৭৯২টি। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫টি। অর্থাৎ দুই শুমারির ব্যবধানে ইউনিট বেড়েছে ৪৯.৬৮ শতাংশ।
শুমারি অনুযায়ী, এই ১০ বছরে কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫ শতাংশ। দেশের অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে নিয়োজিত মোট জনবল ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১ জন। ২০১৩ সালে ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০ জন। মোট জনবলের ৮৩.২৮ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬.৭১ শতাংশ নারী। এ ছাড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) অংশগ্রহণ (০.০১ শতাংশ) রেকর্ড করা হয়েছে। কর্মসংস্থানে লিঙ্গবৈষম্য এখনো স্পষ্ট। মোট কর্মসংস্থানের ৭৭.৫৩ শতাংশই স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীভূত।
শুমারির তথ্য বলছে, গ্রাম ও শহর–উভয় এলাকাতেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে পল্লি এলাকায় রয়েছে ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮২৮টি ইউনিট। শহরে ৪৩ লাখ ১৬ হাজার ৯৬৪টি। ২০১৩ সালের তুলনায় দুই এলাকাতেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি হয়েছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
দেশের মোট ইউনিটের মধ্যে ৫৩.৫৭ শতাংশই (৬২ লাখ ৬৯ হাজার ৪৫৭টি) স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। অস্থায়ী প্রতিষ্ঠান ৪.৯১ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসম্পন্ন খানা ৪১.৫২ শতাংশ। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সর্বোচ্চ ২৭.০৮ শতাংশ ইউনিট ঢাকা বিভাগে, সর্বনিম্ন ৪.৬৭ শতাংশ সিলেটে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইউনিট রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংখ্যার দিক থেকে দেশের অর্থনীতিতে মাইক্রো ও কুটির শিল্পের প্রাধান্য স্পষ্ট। মোট ইউনিটের ৫৬.৬৭ শতাংশ মাইক্রো এবং ৩৮.৭৪ শতাংশ কুটির শিল্প। বিপরীতে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পের অংশ খুবই সামান্য; যথাক্রমে ০.৩১ ও ০.০৮ শতাংশ।
অর্থনৈতিক ইউনিটে ব্যক্তিগত মালিকানাই প্রধান। স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮৭.৩৬ শতাংশই ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন। অলাভজনক, সরকারি, প্রাইভেট লিমিটেড ও অংশীদারত্বভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের অংশ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
এই শুমারিতে দেশে অর্থনৈতিক ইউনিটে সেবা খাতের ব্যাপক আধিপত্য উঠে এসেছে। মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের ৯০.০২ শতাংশই সেবা খাতভুক্ত, যেখানে শিল্প খাতের অংশ মাত্র ৯.৯৮ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা এবং মোটরযান মেরামত খাতে ৪১.৮২ শতাংশ ইউনিট রয়েছে। এ ছাড়া পরিবহন ও মজুত (২২.২২ %), উৎপাদন (৯.৫৭ %) এবং আবাসন ও খাদ্যসেবা (৮.১১ %) খাতেও উল্লেখযোগ্য ইউনিট রয়েছে।
বিবিএসের মহাপরিচালক ফরহাদ সিদ্দিকের সভাপতিত্বে অর্থনৈতিক শুমারি প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার ও পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রকল্পের পরিচালক ড. দিপংকর রায়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রকল্পের উপপরিচালক মিজানুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে মহাপরিচালক ১০ বছরের পরিবর্তে ৫ বছর অন্তর অর্থনৈতিক শুমারি করার প্রস্তাব করেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে এতে সম্মতি দেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো–অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে মজবুত অর্থনীতির দিকে এগোনো। সে জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ছাড়া বিনিয়োগ বৃদ্ধি সম্ভব হবে না। এ জন্য বিবিএসকে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত করতে হবে।
অর্থনৈতিক শুমারির মাধ্যমে দেশের কৃষিবহির্ভূত সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া গেছে বলে জানান পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব আলেয়া আক্তার। তিনি বলেন, এতে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, ধরন, কর্মসংস্থান ও খাতভিত্তিক কার্যক্রমসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, এই শুমারির মাধ্যমে অর্থনীতির কাঠামো, খাতভিত্তিক বণ্টন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হয়েছে, যা পরিকল্পনা প্রণয়নে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থনৈতিক ইউনিট সেবা খাতে এবং বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোগ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাই উন্নয়ন কৌশলে এসএমই, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং বেসরকারি খাত-নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধিকে আরও উৎসাহিত করতে হবে।