হোম > অর্থনীতি

মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব

জ্বালানির জ্বালা ঘরে-বাইরে

শাহ আলম খান, ঢাকা 

ডিজেলের সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকেরা। সেচ ও কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সংগ্রহে পাম্পে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছেন তারা। গতকাল মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে। ছবি: মেহেদী হাসান

জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫-২০ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণার পর থেকে সর্বত্র একধরনের অস্থিরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে ঘোষণা এল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বৃদ্ধির। সেটাও বেশ বড় বৃদ্ধি, ১৭ দিনের ব্যবধানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৫৯৯ টাকা। সামনে বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

জ্বালানির বাড়তি দামের অভিঘাত পড়বে শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি পর্যন্ত। ধাপে ধাপে পরিবহন, শিল্প ও কৃষি উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়িয়ে দেবে। আর সবটাই শেষ পর্যন্ত যাবে ক্রেতা-ভোক্তার পকেট থেকে।

অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা করছেন, যখন মানুষের আয় স্থবির এবং অনেকের ক্ষেত্রে সংকুচিত হচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় ভোগ্য ও সেবাপণ্যের বাড়তি দাম—মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেবে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। এই বাস্তবতায় ধীরে ধীরে ভোগ সংকুচিত হলে সামগ্রিক অর্থনীতি ভারসাম্য হারাতে পারে; যা দেশের সাম্প্রতিক বছরগুলোর নিম্নতর প্রবৃদ্ধিকে আরও নিম্নমুখে ঠেলে দেবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন গতকাল রোববার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জ্বালানি প্রায় সব খাতের প্রধান উপকরণ। এর মূল্যবৃদ্ধি একটি ক্লাসিক “কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন” তৈরি করে। এতে পুরো উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় খরচ বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।’

যদিও এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, সরকার মূল্যবৃদ্ধি না ঘটালেও দেশে যে প্রবণতা চলছে, তাতে মূল্যস্ফীতির চোখ রাঙানি ঠেকানো যেত না। আবার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সরকারের হাতে এর বিকল্পও ছিল না।

পরিবহন খাত ইতিমধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের প্রথম এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাসভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, কোনো কোনো পরিবহন গতকাল থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ায় আমাদের খরচ ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় ভাড়া না বাড়িয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়।’

ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট। বাজারে আগে থেকে পণ্যের দাম চড়া। এখন এই বাড়তি পরিবহন ব্যয়ও পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এক সবজি বিক্রেতা জানালেন, শনিবার মধ্যরাত থেকে পাইকারি দামে কেজিপ্রতি ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাছ ও মাংসের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চাল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ধীরে ধীরে বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, এটি শুধু শুরু। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানান, ‘জ্বালানি খরচ বাড়লে তার প্রভাব সর্বত্র পড়ে, শিল্প খাতেও পড়বে। এতে করে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কাঁচামাল পরিবহন, পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়বে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, আর তা বাজারে দামের মাধ্যমে সমন্বয় হবে।’

আন্তর্জাতিকবাজারে দাম বাড়তি, তাই দেশেও সরকার বাড়িয়েছে জানিয়ে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘শুধু এটাই আহ্বান থাকবে, সেখানে কমলে যেন দেশেও দ্রুত মূল্য সমন্বয় করা হয়।’

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। গাজীপুরের এক গার্মেন্টস সাব-কন্ট্রাক্টর বলেন, ‘আমাদের মার্জিন এমনিতেই কম। এখন যদি পরিবহন খরচ ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ে, তাহলে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যাবে।’ অনেক ছোট উদ্যোক্তা উৎপাদন কমানোর কথা ভাবছেন, যা কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের আশপাশে ঘোরাফেরা করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সেই চাপকে আরও তীব্র করবে।

অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ও পরিবহন খাতে ব্যয় হয়।’

বাস্তব চিত্রও তাই বলছে। রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা রিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আগে যা ইনকাম হতো, এখন তার অর্ধেকও থাকে না। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আমরা ভাড়া বাড়াতে পারছি না।’

অন্যদিকে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী নাজমা আক্তার বলেন, ‘মাসের শেষে কিছুই হাতে থাকে না। এখন আবার ভাড়া আর বাজার খরচ বাড়লে চলা আরও কঠিন হয়ে যাবে।’

ভোক্তাদের এই সংকোচন আচরণ অর্থনীতির জন্য একটি বড় সংকেত। যখন মানুষ কম খরচ করে, তখন বাজারে চাহিদা কমে যায়। এর ফলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি কমে, উৎপাদন কমে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যায়।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ও বিআইডিএসএর সাবেক মহাপরিচালক ড. এম কে মুজেরি মনে করেন, ‘এটি শুধু মূল্যস্ফীতির বিষয় নয়, এটি “রিয়েল ইনকাম শক”। মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, কারণ আয় বাড়ছে না, কিন্তু ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, আরও বাড়বে।’ তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগ ব্যয় কমে যাবে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।

এদিকে সরকারের রাজস্ব ও ভর্তুকি ব্যবস্থাপনাও এই সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমালে বাজেট ঘাটতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, এই ধরনের সমন্বয়ের ক্ষেত্রে একটি ‘বাফার’ বা সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেমন নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা, পরিবহন খাতে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি, বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার তদারকি জোরদার করা।

পাম্পে অকটেন ২০, পেট্রল ও ডিজেল ১০ শতাংশ সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশ

ব্র্যাক ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের ফেলোশিপ: তরুণ উদ্যোক্তাদের পাশে ব্র্যাক

মিম শেয়ার করার মধ্যে যৌন নির্যাতন কোথায়—সংসদে প্রশ্ন হাসনাতের

তামাকে কর বাড়ানোর তাগিদ

১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ২১২ টাকা

আইএমএফের সঙ্গে তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী

এমডব্লিউ বাংলাদেশের উদ্যোগে ‘মায়া বেঙ্গল ইন মোশন’-এর আয়োজন নকশী কাঁথার মাঠ

বাংলাদেশ রিটেইল অ্যাওয়ার্ডসে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেল ফুডি

সরকার বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে: জ্বালানিমন্ত্রী

১০ রুপির পানীয়, নাম পাকিস্তানি: ভারতে যেভাবে গড়ে উঠল ২৮০০ কোটির ব্র্যান্ড