ভর্তুকি কমাতে বরাবরই চাপ দিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এরপরও আগামী অর্থবছরে ভর্তুকির পেছনে সরকারের ব্যয় আরও বাড়তে চলেছে। মূল্যস্ফীতির চাপ, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার এই সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি—এই চার খাতে সহায়তা ব্যয় কমানোর সুযোগ কার্যত সংকুচিত হয়ে গেছে। আবার সরকারও চাইছে না এই সময়ে ঝুঁকি নিতে। বরং চলমান পরিস্থিতিকেই গুরুত্ব দিয়ে সংকট মোকাবিলায় আগের মতোই নীতিগত সহায়তা বাড়াতে যাচ্ছে সরকার।
এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি প্রণোদনা ও নগদ ঋণসহায়তায় মোট ব্যয়ের প্রাথমিক প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা; চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাষ্ট্রীয় সহায়তা বাড়তে চলেছে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
এই ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যাচ্ছে ভর্তুকিতে। প্রাথমিকভাবে ভর্তুকি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৭২ হাজার ১০০ কোটি টাকা; চলতি সংশোধিত বাজেটে যা ছিল ৬৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এই ভর্তুকির মধ্যে বেশি অর্থ যায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। বিদ্যুৎ খাতে এককভাবে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা আগের বছরের সমান। গ্যাস আমদানিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং সারে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা সরকারকে নতুন করে চিন্তায় ফেলেছে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে। পরে সেই চাপ ছড়িয়ে পড়ে শিল্প উৎপাদন এবং ভোগ্যপণ্যের বাজারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকার চাইলে পুরো ব্যয় সমন্বয় করে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারে। কিন্তু তখন শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়বে। বাজারে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে। সেই ঝুঁকি এখন সরকার নিতে চাইছে না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে ভর্তুকি কমানো বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, উৎপাদন ব্যয় এবং ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য এখনো অনেক ব্যবধান তৈরি করে রেখেছে। এই ব্যবধান কমানো ছাড়া ভর্তুকি হ্রাস কার্যত সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—সরকার এখনো বাজারকে পুরোপুরি মুক্ত করে দেওয়ার অবস্থায় নেই। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সংস্কার চাপের মধ্যেও রাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত বড় ব্যয়ের ভর্তুকিনির্ভর পথেই হাঁটতে হচ্ছে।
এই কারণেই খাদ্য খাতেও সহায়তা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। খাদ্য ভর্তুকি ধরা হচ্ছে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২১৪ কোটি টাকায়। খাদ্য অধিদপ্তরসংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ওএমএস, টিসিবি এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি সারা বছর চালু রাখার সিদ্ধান্তের কারণে এই খাতে ব্যয় কমানোর কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে সার কেনায় বড় আকারের ভর্তুকি দেওয়ার কারণে কৃষি খাতে প্রণোদনা আগের বছরের মতোই ১৭ হাজার কোটি টাকায় অপরিবর্তিত থাকছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মাহবুব হোসেন বলেন, সারের আন্তর্জাতিক বাজার, জ্বালানির মূল্য এবং কৃষি উপকরণের ব্যয় সবই অনিশ্চিত। এই অবস্থায় কৃষককে সহায়তা না দিলে উৎপাদন সরাসরি ঝুঁকিতে পড়বে। তাই সরকার প্রণোদনা ধরে রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রণোদনা খাতেও নীতিসহায়তা রাখা হচ্ছে ৩২ হাজার ২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে রপ্তানি খাতে ৭ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা এবং পাট খাতে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা প্রণোদনা আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকছে। তবে রেমিট্যান্স প্রণোদনা বর্তমানের ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বৈদেশিক মুদ্রাপ্রবাহ স্থিতিশীল রাখতে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ ধরে রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নগদ ঋণসহায়তা খাতেও আরও ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতে যাচ্ছে সরকার, যা বিবিধ খাতের আওতায় থোক বরাদ্দ আকারে প্রয়োজনে ব্যবহার করা হবে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশ এখন একধরনের নীতিগত দ্বন্দ্বের মধ্যে আছে। একদিকে দাতা সংস্থার শর্ত প্রতিপালন, অন্যদিকে রাজস্ব সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা। ফলে ভর্তুকি একটি স্থায়ী চাপ হিসেবে বাজেটে থেকে যাচ্ছে, যেখান থেকে সহজে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।