কোরবানির চামড়ার বাজার আগের মতো এবারও বহুমুখী সংকটে আবর্তিত হচ্ছে। বাজারে লবণের মূল্যবৃদ্ধি, ট্যানারি পর্যায়ে বকেয়া অর্থ, ব্যাংকঋণের সংকট, মহাজনের ঋণে উচ্চ সুদ এবং সরকারের নির্ধারিত দামের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা শঙ্কিত অবস্থায় আছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যশোরের রাজারহাট মোকাম থেকে খুলনার শেখপাড়া চামড়াপট্টি পর্যন্ত কোরবানির চামড়া সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় এখন এমন অনিশ্চয়তা উঁকি দিচ্ছে। ফলে মাঠপর্যায়ের সংগ্রহকারী মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও শঙ্কিত। এই চিত্র কেবল দুটি অঞ্চলের সীমাবদ্ধ সংকট নয়, বরং পুরো দেশের কোরবানির চামড়া বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি।
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সরকার গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ঢাকায় ৬২-৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭-৬২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দামে বেচাকেনা হবে কি না, তা নিয়ে যশোরের রাজারহাটে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁরা মনে করেন, সরকার-নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর মনিটরিং না থাকলে বাজারে প্রকৃত দামের প্রতিফলন ঘটবে না। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। লবণের দামেও শঙ্কিত। তাঁরা জানিয়েছেন, চামড়া সংরক্ষণের প্রধান অনুষঙ্গ লবণের দাম ইতিমধ্যে বস্তাপ্রতি প্রায় এক শ টাকা বেড়ে গেছে, ফলে খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা চাপে পড়েছেন।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, সরকারিভাবে লবণ বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা তাঁরা পান না এবং বিতরণের পরও অনেক ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে কাজে লাগে না। আরেক ব্যবসায়ী আনন্দ দাস জানান, ব্যাংকঋণ না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে এনজিও ও মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে চামড়া কিনতে হয়, যার ফলে ন্যায্যমূল্য থেকে তাঁরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজারহাট মোকামের আড়তদার আবদুল মালেক বলেন, আড়তদারেরা পুঁজির সংকটে ভুগছেন। ট্যানারিমালিকদের কাছে বিপুল পরিমাণ বকেয়া টাকা আটকে রয়েছে এবং ঈদের আগে এই অর্থ না পেলে সংকট আরও বাড়বে।
সার্বিক বাস্তবতায় চামড়া পাচার রোধে কঠোর মনিটরিং এবং রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের দাবি রয়েছে এখানকার ব্যবসায়ীদের। যশোরে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার রাজারহাট মোকামে খুলনাসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনাবেচা করেন। সেখানে দুই শতাধিক আড়ত ও প্রায় দুই হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান আজকের পত্রিকাকে জানান, চামড়ার বাজার মনিটরিং ও পাচার রোধে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন।
অন্যদিকে খুলনায় শেখপাড়া এলাকায় চামড়া ব্যবসার ঐতিহ্য থাকলেও স্থায়ী বাজার না থাকায় গত সাত বছরে অনেক দোকান বন্ধ হয়ে গেছে এবং ব্যবসায়ীরা এখন সিটি করপোরেশনের কাছে স্থায়ী মার্কেট প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন। শেখপাড়ার ব্যবসায়ী বাবর আলী বলেন, দোকান সংকট ও ট্যানারি থেকে টাকা না পাওয়ায় অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে এখানে নতুন মার্কেট না হলে এই অঞ্চল থেকে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ, বেচাবিক্রিতে সংকট আরও বাড়বে।
খুলনায় কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম ঢালী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘খুলনায় চামড়া ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এখানে নেই কোনো আধুনিক জবাইখানার ব্যবস্থা। যেখানে নিরাপদে টাকাপয়সা নিয়ে গিয়ে চামড়া কিনতে পারব। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, এত দিনেও গড়ে ওঠেনি একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের মার্কেট। চামড়া ব্যবসায়ীদের এবং এই শিল্প বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
অন্যদিকে একই সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক ঘোষ বলেন, শেখপাড়া চামড়াপট্টির সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। তখন মহাজন ছিল। আর মৌসুমে ফড়িয়ারা ব্যবসা করত। এখন মহাজন-ফড়িয়া বলে কিছু নেই। সবাই ব্যবসায়ী। তার চেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় তাঁদের ব্যবসাও ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। অনেক পুরোনো ব্যবসায়ীই এখন আর এই খাতে সক্রিয় নেই।
মার্কেট প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রশাসনের পরিকল্পনা জানতে চাইলে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু আজকের পত্রিকাকে বলেন, ব্যবসায়ীরা প্রস্তাব দিলে স্থায়ী বাজার স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
দেশের চামড়াশিল্প একসময় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে পরিচিত থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পুঁজির সংকট, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং রপ্তানি বাজারে সীমিত প্রবেশাধিকার এই খাতকে চাপে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু দাম নির্ধারণ নয়, বরং আর্থিক সহায়তা, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সমন্বিত নীতি গ্রহণ জরুরি। ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, নতুন করে অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থায়ী বাজার প্রতিষ্ঠা এবং বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা গেলে চামড়া খাত আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। এতে করে প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জীবনযাত্রায়ও স্বস্তি ফিরবে।