বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সুনামগঞ্জে এক দশকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২৪টি বজ্রনিরোধক দণ্ড (লাইটনিং অ্যারেস্টার) স্থাপন করে সরকার। এ ছাড়া তালগাছ রোপণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। তবে ব্রজপাতে মানুষের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘই হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে এ পর্যন্ত ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ১৮ এপ্রিল জেলায় বজ্রপাতে ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, বজ্রনিরোধক দণ্ড কিনতে সরকার কোটি টাকা ব্যয় করলেও এর কেউ খোঁজ রাখেন না। এই ব্যবস্থা কোনো কাজেও আসছে না।
সুনামগঞ্জে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলে হাওরবাসীর মাঝে বজ্র-আতঙ্ক দেখা দেয়। সরকারি হিসাব মতে, গত পাঁচ বছরে এ পর্যন্ত ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৬ জন, ২০২৩ সালে ২৯, ২০২৪ সালে ১১ জন, ২০২৫ সালে ১৫ জন ও ২০২৬ সালের বুধবার পর্যন্ত ৭ জন মারা গেছে। বেসরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি।
হাওর এলাকায় মার্চ, এপ্রিল, মে—এই তিন মাস কালবৈশাখীর সঙ্গে প্রচণ্ড বজ্রপাত হয়। এ সময়কালে বোরো ফলন ঘরে তোলাসহ আনুষঙ্গিক কাজে হাওরে ব্যস্ত থাকে অধিকাংশ মানুষ। তখন আকস্মিক বজ্রপাতে হাওরে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এতে কৃষক ও জেলে পরিবারের লোকজন সবচেয়ে বেশি হতাহতের শিকার হয়। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে সরকার কোটি টাকায় তালগাছ রোপণ কার্যক্রম থেকে শুরু করে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করলেও কার্যত কোনো ফল পায়নি হাওরাঞ্চলের মানুষ।
সুনামগঞ্জ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলার ছয় উপজেলায় ১৮টি দণ্ড স্থাপন করে ‘ক্রিয়েটিভ সোলার অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৪টি, জামালগঞ্জে ৩টি, তাহিরপুরে ৩টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৩টি, ধর্মপাশায় ৩টি এবং শাল্লা উপজেলায় ২টি বজ্রনিরোধক দণ্ড রয়েছে। ১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে দণ্ডগুলো স্থাপন করে দুর্যোগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়। কাগজপত্রে ১৮ দণ্ড স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হলেও খোঁজ নিয়ে হাটবাজার ও জনবহুল এলাকায় মোট ২৪টি দণ্ড স্থাপনের বিষয়টি জানা গেছে। দুর্গম হাওরের বৃক্ষহীন খোলা প্রান্তর বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় স্থানে এগুলো বসানো হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
সরকারি তথ্য মতে, ৪০ ফুট উচ্চতার এই দণ্ড চারপাশের ১১০ মিটার জায়গাজুড়ে বজ্রপাত নিরোধের সক্ষমতা রাখে। তবে এসব বজ্রনিরোধক স্থাপনের পর থেকে এই যন্ত্রগুলো বজ্রপাত নিরোধ করতে পেরেছে এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। এমনকি এই দণ্ড সচল না অচল—এ সম্পর্কিত নিশ্চিত তথ্য জানাতে পারেননি জেলা ও উপজেলার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন।
বজ্রদণ্ড স্থাপন করা হয়েছে এমন একাধিক স্থান ঘুরে দেখা যায়, জামালগঞ্জের সাচনা বাজার, ভীমখালী বাজার, উপজেলা পরিষদ ভবন ও বেহেলী বাজারের যেসব স্থানে দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে, সেই জায়গাগুলোতে বজ্রপাতের ঝুঁকি কম। কারণ, এসব এলাকায় একটু বৃষ্টি হলে মানুষ যেকোনো জায়গায় সহজে আশ্রয় নিতে পারেন। এই দণ্ড স্থাপন ও কার্যকারিতার বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না স্থানীয়রা।
সাচনা বাজারে বজ্রদণ্ড স্থাপনের বিষয়টি হাস্যকর বলেছেন ওই বাজারের ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন তালুকদার। তিনি বলেন, বজ্রপাতে জেলে ও কৃষিজীবী মানুষ বেশি মারা যায়। হাটবাজারে অবস্থানরত মানুষ বজ্রপাতে নিহত হয়েছে এমন খবর শুনিনি। দণ্ড স্থাপনে গবেষক ও স্থানীয়দের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।
সুনামগঞ্জে ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’-এর সহযোগী সংগঠন ‘হাওর রক্ষায় আমরা’র সদস্য সজল কান্তি সরকার বলেন, এই দণ্ড দুর্গম হাওরের বদলে গাছপালাযুক্ত জনবহুল স্থানে বসানো হয়েছে। যেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি নেই বললেই চলে। দুর্গম এলাকায় বসালে এর কার্যকারিতা জানা যেত। এগুলো দায়সারা কার্যক্রম ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ সোলার অ্যান্ড টেকনোলজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা নাসরিন বলেন, ‘দুই মাস আগে পরীক্ষা করে দেখেছি, সব ঠিক আছে। এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন উপজেলার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দিয়েছি। আমাদের দুই বছরের ওয়ারেন্টি (নিশ্চয়তা) শেষ হয়েছে। এখনো জামানত পাইনি।’
এদিকে ব্রজপাতের ক্ষতি কমাতে এই জেলায় রোপণ করা হয়েছে তালগাছ। ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় ৪০ হাজার তালগাছ রোপণ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তালগাছের দৃশ্যমান কোনো অস্তিত্ব নেই। এ প্রকল্পেও আশানুরূপ ফল না পাওয়ার অভিযোগ আছে।
তবে ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, বজ্রঝুঁকি কমাতে সরকারিভাবে কোথাও তালগাছ রোপণ করতে দেখিনি। তবে ব্র্যাক সংস্থা থেকে কিছু তালগাছ লাগানো হয়েছিল। সেগুলো পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাসিবুল হাসান বলেন, দণ্ডগুলো সচল আছে কি না, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তাঁরা এর কার্যকারিতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে হাসিবুল হাসান বলেন, জেলার ১২টি উপজেলায় দণ্ড স্থাপনের ব্যাপারে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছিল। পরে ৬ উপজেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দণ্ডগুলো স্থাপন করা হয়েছে।