হোম > সারা দেশ > সুনামগঞ্জ

ফাঁদে ইউরোপযাত্রা

সর্বস্ব হারিয়ে ফিরছেন সুনামগঞ্জের তরুণেরা

বিশ্বজিত রায়, সুনামগঞ্জ

ফাইল ছবি

স্বপ্নের ইউরোপে পাড়ি জমানোর আশায় সুনামগঞ্জের শত শত তরুণ জীবন বাজি রেখে বেছে নিচ্ছেন ভূমধ্যসাগরের ভয়ংকর রুট। কেউ গন্তব্যে পৌঁছালেও অনেকের স্বপ্ন থেমে যাচ্ছে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে, আবার কেউ লিবিয়ার মাফিয়া চক্রের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে ফিরছেন দেশে। দালালদের প্রলোভনে লাখ লাখ টাকার সম্পদ বিক্রি করে বিদেশের উদ্দেশে যাত্রা করা এসব তরুণের অনেকেই এখন বন্দিদশা, নির্যাতন ও মুক্তিপণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাক্ষী। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সামনে এসেছে এই ভয়ংকর মানব পাচার চক্রের নির্মম বাস্তবতা।

অভিবাসন নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এমআরএসসির হিসাব অনুযায়ী, গত দুই বছরে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরেছেন সুনামগঞ্জের ২১৫ জন। ঘটনার অধিকাংশ চাপা থাকলেও ২১ মার্চ ভূমধ্যসাগরে জেলার ১৩ তরুণের মৃত্যু দালাল চক্রের নির্মমতাকে সামনে নিয়ে আসে।

এনজিও সংস্থা ও ভুক্তভোগীদের দাবি, গ্রামগঞ্জের যুবকদের ইউরোপের ফাঁদে ফেলে নির্মমতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে চক্রটি। সম্প্রতি সাগরপথে মৃত্যুর ঘটনায় দিরাই ও জগন্নাথপুর থানায় পৃথক মামলা হলেও মামলার পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ আছে ভুক্তভোগী পরিবারে।

সম্প্রতি নির্যাতনের শিকার হয়ে বাড়ি ফিরেছেন জামালগঞ্জের নাজিমনগর গ্রামের নুরু মিয়ার দুই ছেলে ইয়াছিন মিয়া ও জীবন মিয়া এবং একই গ্রামের আব্দুস শহীদের ছেলে মো. মামুন মিয়া। গত ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁরাসহ ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন ওই গ্রামের পাঁচ যুবক। নানা ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে সৌদি আরব থেকে মিসরের আলেকজান্দ্রা হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে পৌঁছান তাঁরা। পরে মাফিয়া চক্র নিজেদের আস্তানায় নিয়ে করে নির্মম নির্যাতন।

ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিবেশী দিলুরা বেগম, তাঁর ছেলে মো. হুমায়ুন ও মেয়ের জামাই নজরুল ইসলামের মাধ্যমে লিবিয়া যান গ্রামের ১২ জন। জনপ্রতি ১৪ লাখ টাকার মধ্যে লিবিয়া পর্যন্ত ৫ লাখ ও ইতালি পৌঁছামাত্র বাকি টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী লিবিয়া পৌঁছালে সেখানে দালাল সোহেল মিয়া ও ভৈরবের মো. নিলয়ের খপ্পরে পড়েন তাঁরা। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় চুক্তির বাকি টাকা হাতিয়ে নেয় তারা। এরপর বন্দুকধারী মাফিয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাঁদের। সেখানে জনপ্রতি সাড়ে ২৬ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়ে শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন।

মামুন মিয়া বলেন, ‘প্রচুর মাইড়-দুইড় (টর্চারিং) করছে। খাওনও ঠিকভাবে দিছে না। হাত-পা বাইন্ধা সারা রাইত বাথরুমে ফালাইয়া রাখছে। ভিডিও কইরা ফ্যামিলির মানুষরে দেখাইছে। জনপ্রতি সাড়ে ২৬ লাখ টেকা দিলে ছাড়ব, না হইলে মাইরা ফালাইয়া দিব। বাড়ি পর্যন্ত আইতে ৫২ লাখ টাকা খরচ হইছে।’

লিবিয়ার মাফিয়া-দালাল সবাই বাংলাদেশি উল্লেখ করে মামুন বলেন, ‘টেকা দেওয়ার লাইগ্যা লিবিয়ার দালাল ভৈরবের কুলিয়ারচরের দাড়িয়াকান্দির ছয়সতী বাজারের মামুন নামে একজনের দোকানের ঠিকানা দিছে। বাড়ির জায়গা-জমি, গরু-বাচুর বিক্রি কইরা এইখানে টেকা জমা দেওয়ার পরে আমারে ছাড়ছে। অন্যরা রইয়া গেছে। যারা টেকা দিতে পারতাছে না, তাদের ওপরে অত্যাচার চলছে।’

আরেক ভুক্তভোগী ইয়াছিন জানান, বাড়ি ছাড়ার আগে তাঁরা দুই ভাইয়ের ১০ লাখ টাকা তুলে দেওয়া হয় স্থানীয় দালালের (দিলুরা-হুমায়ুন) হাতে। ত্রিপোলি যাওয়ার পর রক্তে সমস্যা থাকায় আলাদা রাখা হয় তাঁকে। ভিন্নপথে ইতালি যাওয়ার প্রলোভনে দালালদের আরও ২ লাখ টাকা দেয় পরিবার। প্রতারিত হয়ে অন্য দালালের আস্তানায় গেলে সেখান থেকে পুলিশ ইয়াছিনকে ধরে নিয়ে বেনগাজির গাম্বুদা জেলে পাঠিয়ে দেয়। গাম্বুদা জেলের এক মাস ১৮ দিনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ইয়াছিন বলেন, ‘জেল থেকে যোগাযোগ করলে আব্বা কইতাছে—জীবনরে ছাড়াইতে মাফিয়া ৩০ লাখ টাকা নিছে। পুত, দেওয়ার মতো কিচ্ছু নাই, সব শেষ। পরে আইওএম (আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা) ধইরা বাড়ি আইছি।’

ইয়াছিনের ভাই জীবন মিয়া বলেন, ‘মাফিয়ার আস্তানায় আমরা ৬০-৬৫ জন ছিলাম। এই আস্তানায় প্রতিদিনই লোক আসতেছে, বের হইতাছে। সব জিম্মিদেরকেই টর্চারিং করে। যারা টাকা দিতাছে, তারা ছাড়া পাইতাছে। ছুইটা আইতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ হইছে আমার।’

এসবে জড়িত না উল্লেখ করে অভিযুক্ত হুমায়ুন বলেন, ‘দোয়ারাবাজারের প্রতাপপুর গ্রামের দালাল সোহেলের মাধ্যমে সবাই লিবিয়া গেছে। আমার বোনজামাই, ভাগ্না, ভাতিজাও লিবিয়ায় বন্দী। গ্রামের কয়েকজন আমরারে দোষারোপ করতাছে। লিবিয়ায় অবস্থানরত সোহেল আমাদের থেকেও তার পরিবারের মাধ্যমে টাকা নিছে। টাকাপয়সা দিয়া আমরাও বিপদে আছি।’

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন রিসোর্স অ্যান্ড সার্ভিস সেন্টার (এমআরএসসি) সুনামগঞ্জের কো-অর্ডিনেটর মো. নজরুল ইসলাম জানান, সাগরপথে মৃত্যু কিংবা মাফিয়া চক্রের নিপীড়নের সংখ্যা অগণিত। ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত নির্যাতিত হয়ে বাড়ি ফিরেছে সুনামগঞ্জের ২১৫ জন। আইওএম ও সরকারিভাবে প্রাপ্ত এই সংখ্যা ছাড়া নিজ খরচে বাড়ি ফেরাদের সংখ্যাও অনেক। এদের সবাই স্থানীয় ও বিভিন্ন জায়গার দালালের মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।

দালালদের বিরুদ্ধে মামলার ব্যাপারে জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, ভূমধ্যসাগরে নিহতের ঘটনায় জগন্নাথপুর থানায় মামলা হয়েছে। মামলাটি ঢাকার সিআইডি তদন্ত করছে।

জগন্নাথপুরে বিদ্যুতায়িত হয়ে বৃদ্ধের মৃত্যু

সুনামগঞ্জে দুই পক্ষের সংঘর্ষে যুবক নিহত, আহত ১০

জলাবদ্ধতায় হাওরে ফসলহানি: ঋণের বোঝা নিয়ে ফিরছে ৫ শতাধিক জিরাতি পরিবার

রাতের আঁধারে দুটি পুকুরে শত্রুতার বিষ, মরল ৫ লক্ষাধিক টাকার মাছ

জগন্নাথপুরে তালাবদ্ধ ঘর থেকে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

ডোবার পাশে পড়ে ছিল নারীর ক্ষতবিক্ষত লাশ

ডোবার পাশে পড়ে ছিল অজ্ঞাত নারীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ

লন্ডনে আবারও কাউন্সিলর নির্বাচিত জগন্নাথপুরের মেয়ে অজন্তা

সুনামগঞ্জে বাস-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষ, নিহত ৫

জামিনে বের হয়ে বাদীপক্ষের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর, আহত ৩