সুনামগঞ্জে স্বস্তির বৃষ্টিতে কৃষকের মনে ভালো ফলনের আশা সঞ্চারিত হয়েছে। বোরো মৌসুম শুরুর পর থেকে টানা খরায় ফলন বিপর্যস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল হাওরে। গতকাল রোববার গভীর রাতের একপশলা বৃষ্টি সব দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছে কৃষকের।
দীর্ঘ খরায় হাওর এলাকার মানুষ বৃষ্টি কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতেরও আয়োজন করেছিল। গতকাল জামালগঞ্জের ভীমখালী ইউনিয়নের আঙ্গুলভাঙা হাওরের মাঠে স্থানীয় কৃষকেরা এ মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন। গতকাল রাতের বৃষ্টি আল্লাহর রহমত বলে উল্লেখ করেছেন কেউ কেউ।
হাওরের রাজধানীখ্যাত সুনামগঞ্জে ছোট-বড় হাওর রয়েছে প্রায় ২০০টি। এর মধ্যে টাঙ্গুয়া, শনি, হালি, মহালিয়া, পাগনা, চন্দ্র সোনার থাল, সোনামড়ল, ধানকুনিয়া, দেখার হাওর, ছায়ার হাওর, বরাম, উদগল, মাটিয়ান, কড়চা, আঙ্গরখালি, সানুয়াডাকুয়া, মইয়ার হাওর ও নলুয়ার হাওর অন্যতম। সবগুলোতেই কমবেশি বোরো আবাদ হয়ে থাকে।
বোরোভান্ডার হিসেবে এই হাওরাঞ্চলের আলাদা খ্যাতি আছে। সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এখানকার উৎপাদিত বোরো ধান। এ ধান হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস। বোরো আবাদের সময়কালে প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে কৃষকের মন ভালো থাকে। আবার খরা-অতিবৃষ্টি থাকলে কৃষক দুশ্চিন্তায় ভোগেন। দীর্ঘ খরার পর গতকাল রাতের বৃষ্টি কৃষকের মনে আলাদা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
দিরাই উপজেলার বরাম হাওরপাড়ের সরালীতোপা গ্রামের কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরার এইদিকে আজ পয়তাবেলা (ভোরে) বৃষ্টি হইছে। এই বৃষ্টি বোরো ফলনের লাগি খুব দরকার ছিল। বৃষ্টি হওয়ায় হাওরের রং এখন পাইল্টা (পরিবর্তন) যাইব। সব ক্ষেত্রেই উপকার হইব।’
তাহিরপুরের শনির হাওরপাড়ের গোবিন্দশ্রী গ্রামের বোরোচাষি সেলিম আখঞ্জী বলেন, খরায় হাওরের জমি জ্বলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। এই বৃষ্টি আল্লাহর রহমত হয়ে এসেছে। অনেক উপকার হবে হাওরের।
জগন্নাথপুর পৌরসভার হবিবপুর গ্রামের কৃষক মুমেন মিয়া বলেন, বর্তমানে জমিতে ধানের ‘ছড়া’ বা ‘থোড়’ আসার সময়। এই সময়ে ধানের গোড়ায় পর্যাপ্ত পানির প্রয়োজন, কিন্তু হাওরে পানিসংকট ও বৃষ্টি না হওয়ায় ধানের চারা মরে যাচ্ছিল। বৃষ্টিতে ফসলের প্রাণ ফিরেছে।
চিলাউড়া গ্রামের কৃষক জুবায়ের মিয়া বলেন, তীব্র রোদে গত কয়েক দিন ধরে খেত ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। পানির অভাবে অনেক জায়গায় ধানগাছ লালচে বর্ণ ধারণ করতে শুরু করেছিল। ঠিক এমন সময় এই বৃষ্টি কৃষকদের দুশ্চিন্তা দূর করে মুখে হাসি ফুটিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি সুনামগঞ্জের সহসভাপতি খায়রুল বশর ঠাকুর খান বলেন, বৃষ্টির জন্য কৃষকেরা চাতকের মতো তাকিয়ে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত জেলার অনেক জায়গায় বৃষ্টি হয়েছে। খরায় বোরো ফলনে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, বৃষ্টি হওয়ায় তা অনেকটা কেটে গেছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ হেক্টর জমি বেশি চাষাবাদ হয়েছে সুনামগঞ্জে। জেলার প্রায় দুই লাখ কৃষক এই আবাদ করেছেন। এতে প্রায় ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে; যার বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, এ সময় বৃষ্টি হওয়া ফসলের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। সঠিক সময়ে এ বৃষ্টি হওয়ায় ফসল ভালো হবে। এ বছর ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো ধান রোপণ করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, এ বৃষ্টি কৃষকের বহু কাঙ্ক্ষিত ছিল। এতে কৃষক অনেক খুশি। বিশেষ করে, যেসব উঁচু জমিতে সেচের সুবিধা নেই, সে জমির জন্য খুবই উপকার হয়েছে। এই বৃষ্টির ফলে ধানে চিটা থাকবে না। ধানের মড়ক ভাবটাও দূর হয়ে যাবে। বৃষ্টি-পরবর্তী রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়াও বোরোর জন্য ইতিবাচক। কয়েক দিন পর আরেকটা বৃষ্টি হলে আরও ভালো হবে।